কবির হোসাইন
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
পিরোজপুর দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা
শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষককে জবাবদিহিতা : শিক্ষা প্রশাসনের সীমা কোথায়?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি থাকতে হবে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসন সকলেরই দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি নিয়েও কি আমাদের ভাবার সময় আসেনি? বিশেষত যখন সেই জবাবদিহির দৃশ্যপট তৈরি হয় একটি শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষার্থীদের সামনে এবং ক্যামেরার উপস্থিতিতে।
সম্প্রতি একটি বিদ্যালয় পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নতুন করে সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেখানে দেখা যায়, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা যাচাই করছেন এবং একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইছেন। ঘটনাটি প্রশাসনিক তৎপরতার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে বৃহত্তর প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা হলো একটি শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ ও শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদার বিষয়টি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?
শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একজন শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের তথ্য শেখান ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি শেখান আচরণ, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক সম্পর্কের রীতি। শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক কেবল জ্ঞানের উৎস নন, তিনি একটি প্রতীকও।
সেই প্রতীকের মর্যাদা ক্ষুন্ন হলে তার প্রভাব শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। একজন শিক্ষক যদি কোনো অনিয়ম করে থাকেন, যদি দায়িত্বে অবহেলা থাকে, যদি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ঘাটতি থাকে তবে অবশ্যই তার জবাবদিহি হবে।
কিন্তু সেই জবাবদিহির স্থান কোথায়? শিক্ষার্থীদের সামনে? নাকি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যাখ্যা চাওয়া, তদন্ত করা, প্রতিবেদন প্রস্তুত করা কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সত্য উদ্ঘাটন এবং সমস্যা সমাধান।
কিন্তু যখন জবাবদিহি একটি প্রকাশ্য প্রদর্শনের রূপ নেয়, তখন অনেক সময় মূল লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরে যায়। তখন প্রশ্ন ওঠে আমরা কি সমস্যার সমাধান চাইছি, নাকি সমস্যার দৃশ্যমান উপস্থাপন?
শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা। পৃথিবীর যেসব দেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে, সেসব দেশে শিক্ষককে কেবল কর্মচারী হিসেবে নয়, পেশাজীবী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
তাদের কাছ থেকে জবাবদিহি চাওয়া হয়, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের পেশাগত সম্মানও রক্ষা করা হয়।
আমাদের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। শিক্ষার মানোন্নয়নের গন্ডি পেরিয়ে শিক্ষকদের বছরের পর বছর বহু কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে, যার সঙ্গে সরাসরি শিক্ষাদানের সম্পর্ক নেই। প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন পর্যন্ত অনেক কাজেই শিক্ষকরা যুক্ত থাকেন। ফলে পাঠদানের বাইরেও তাদের ওপর একটি বড় চাপ বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় যদি শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংবেদনশীলতা অনুপস্থিত থাকে, তবে তা একজন শিক্ষককে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বর্তমানে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ক্যামেরা প্রায় প্রতিটি ঘটনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমও এর বাইরে নয়। কিন্তু ক্যামেরা উপস্থিত থাকলে অনেক সময় কর্মকান্ডের চরিত্র বদলে যায়। তখন কার্যকারিতার চেয়ে দৃশ্যমানতা, সমাধানের চেয়ে বার্তা প্রদান এবং সহযোগিতার চেয়ে কর্তৃত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রতিনিধি। অন্যদিকে একজন শিক্ষক রাষ্ট্রের জ্ঞান ও মানবসম্পদ নির্মাণের প্রতিনিধি। উভয়েই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হওয়া উচিত সহযোগিতা ও সম্মানের, নিয়ন্ত্রণ ও ভীতির নয়।
এখানে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি একটি নীতিগত অবস্থানের। আমরা কি এমন একটি শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষকরা নিজেদের সম্মানিত ও নিরাপদ বোধ করবেন? নাকি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে যে কোনো সময় শ্রেণিকক্ষ প্রশাসনিক জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে পরিণত হতে পারে?
জবাবদিহি ও মর্যাদা দুটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য মূল্যবোধ।
একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকবে, কিন্তু ব্যক্তি ও পেশার মর্যাদাও অক্ষুন্ন থাকবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি মানুষ গড়ার কারখানা। শ্রেণিকক্ষ কোনো আদালত নয়; এটি প্রশ্ন, কৌতূহল, চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার স্থান। সেই পরিবেশের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ একজন শিক্ষকের সম্মান কেবল একজন ব্যক্তির সম্মান নয়; তা একটি জাতির শিক্ষাবোধের প্রতিফলন।