ঢাকা ০৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কলকাতার আগুনে নিভে গেল ৭ বাংলাদেশির প্রাণ, বেনাপোলে ফিরল ৫ মরদেহ—স্বজনদের আহাজারিতে ভারী সীমান্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া কামনা বরিশালে বিমানবন্দরে এলাকায় ১০ কেজি গাঁজাসহ বাসযাত্রী গ্রে/প্তার ‎ ‎আইনে নিষেধ, বাস্তবে জমজমাট: পিরোজপুরে সরকারি শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ আদালতের স্থিতাবস্থা অমান্যের অভিযোগ, ওয়াকফ জমি রক্ষায় দুয়ারীপাড়ায় মানববন্ধন তালায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষ/ণচেষ্টা, যুবক আ/টক মক্কায় ডায়মন্ড প্রবাসী গ্রুপের সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত সড়কপথে যুক্ত হচ্ছে ভোলা, মহাসড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় নতুন ৪ মন্ত্রী ও ২ প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও রদবদল করে প্রজ্ঞাপন জারি ধামইরহাট গৃহবধূকে হত্যার পরে আগুনে পুড়ে মামলার তদন্তে আসামি গ্রেফতার

আদালতের স্থিতাবস্থা অমান্যের অভিযোগ, ওয়াকফ জমি রক্ষায় দুয়ারীপাড়ায় মানববন্ধন

সুমন খান:

রাজধানীর রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া বাজারসংলগ্ন প্রায় ৪৮ একর জমি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আইনুদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ স্টেটের কথিত প্লট মালিক ও এলাকাবাসী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাতীয় গৃহায়ন) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, মধ্যস্থতাকারী ও ভূমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জমি বরাদ্দ, দখল, নির্মাণকাজ ও প্লট হস্তান্তরের চেষ্টার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন।

শনিবার অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি থেকে বক্তারা সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত মালিকানা, ওয়াকফ সম্পত্তির আইনগত অবস্থান, আদালতের আদেশ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ প্রক্রিয়া,সবকিছু নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় জমির কোনো ধরনের পরিবর্তন, নির্মাণ বা দখল কার্যক্রম হয়ে থাকলে তা বন্ধ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।আদালতের ‘Status Quo’—কী আছে মামলায়?মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্লট মালিকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল মামলা নং ১৫২১/২০২১ চলমান রয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটিতে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দখল ও অবস্থার ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে।প্লট মালিকদের প্রশ্ন?আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় যদি জমির শ্রেণি, দখল, স্থাপনা কিংবা কাঠামোগত অবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা কীভাবে ঘটল?তাদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি জানা থাকার পরও জমির বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ, দখল ও প্লট নিয়ে লেনদেনের তৎপরতা চলেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ওনথিভিত্তিক সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

৪৮ একর ওয়াকফ সম্পত্তি ঘিরে মূল বিরোধ কোথায়?মানববন্ধনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৮ একর জমি নিয়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ সম্পত্তির বৈধ মোতাওয়াল্লি হিসেবে আবুল কালাম আনসারী জামাল দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের দাবি, জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে বিরোধ চলমান থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নামে জমি বরাদ্দ বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছেন।এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—আদালতে জমির আইনগত অবস্থান নিয়ে মামলা চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে নতুন করে বরাদ্দ বা দখল সৃষ্টির সুযোগ কতটুকু?প্লট মালিকদের দাবি, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মালিকানা বিরোধ নয়; এর সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়নের প্রশ্নও জড়িত।

নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন,মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিরোধপূর্ণ জমির বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরির কাজ হয়েছে বা হচ্ছে। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা ও জমির বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকা উচিত।এ বিষয়ে মামলা নং ৬২/২০২৪-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দিয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে।তবে রাজউকের নোটিশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, সংশ্লিষ্ট ভবনের অনুমোদন, নকশা এবং আদালতের আদেশের সঙ্গে নির্মাণকাজের সম্পর্ক—এসব বিষয় সরকারি নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।ড্যাফোডিল মান্নান ও মোক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ,মানববন্ধনে ড্যাফোডিল মান্নান ও মোক্তার হোসেন নামে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে জমিতে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ তোলা হয়।

প্লট মালিকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে থানায় অভিযোগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নোটিশ দেওয়া হলেও প্রত্যাশিতভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।তবে অভিযোগের বিষয়ে ওই দুই ব্যক্তির বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে লিখিত অভিযোগ, নোটিশ, আদালতের আদেশ এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।সাংবাদিক পরিচয়দানকারী’ ইমনকে ঘিরে নতুন অভিযোগ মানববন্ধন থেকে ইমন নামে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়। প্লট মালিকদের দাবি, তিনি সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ স্টেটের প্রায় ৯০ কাঠা জমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছেন এবং জমি সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন।তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইমনের প্রকৃত পরিচয়, তিনি কোন গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কী নথি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জমি দেওয়ার বিষয়ে তার কোনো বৈধ ক্ষমতা বা দলিল রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।অভিযোগের বিষয়ে ইমনের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন,মানববন্ধনকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো—বিরোধপূর্ণ ওয়াকফ সম্পত্তির জমি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।তাদের দাবি, বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রভাব খাটিয়ে থাকলে কিংবা কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালচক্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট জমির মূল খতিয়ান ও মালিকানা নথি কী বলে।দ্বিতীয়ত, জমিটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে কীভাবে নথিভুক্ত।তৃতীয়ত, আদালতের Status Quo আদেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি কী।চতুর্থত, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বরাদ্দ থাকলে তার তারিখ, স্মারক নম্বর ও আইনি ভিত্তি কী।

পঞ্চমত, বরাদ্দের আগে জমিটির ওপর চলমান মামলা বা আদালতের নির্দেশনা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না।ষষ্ঠত, কোনো ডেভেলপার বা ব্যক্তির নামে জমি হস্তান্তর বা দখলের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে তার বৈধতা কী।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
‘দালালচক্র’,অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি,মানববন্ধনে কথিত, দালালচক্রের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়।

প্লট মালিকদের দাবি, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দিয়ে অর্থনৈতিক লেনদেনে জড়ানোর চেষ্টা করছেন।এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ভূমি বিরোধের বিষয় নয়; প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা অবৈধ লেনদেনের মতো অপরাধের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, চুক্তিপত্র, রসিদ, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা অপরিহার্য।প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি,মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জমির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত অবস্থান নিয়ে বিরোধ থাকলে কোনো পক্ষের প্রভাব বা পরিচয় বিবেচনা না করে প্রশাসনের উচিত নথিপত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা।

তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কেউ যদি জমিতে দখল, নির্মাণ, প্লট বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।এখন সামনে যে প্রশ্নগুলো দুয়ারীপাড়ার এ বিরোধে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আদালতের আদেশের প্রকৃত বিষয়বস্তু, জমির সরকারি ও ওয়াকফ নথি, বরাদ্দের কাগজপত্র এবং নির্মাণ অনুমোদনের বৈধতা।যদি সত্যিই আদালতের Status Quo বহাল থাকা অবস্থায় জমির অবস্থার পরিবর্তন, নতুন নির্মাণ বা দখল হয়ে থাকে, তাহলে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।অন্যদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ যদি বৈধ কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথিও জনসম্মুখে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মানববন্ধনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, অভিযুক্ত ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও আদালতে মামলা চলমান থাকার দাবির কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্লট মালিকরা।তাদের দাবি, আদালতের আদেশ, ওয়াকফ সম্পত্তির নথি, সরকারি বরাদ্দপত্র, ভূমি রেকর্ড, নির্মাণ অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রকাশ্যে এনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করাহোক।মানববন্ধন থেকে ভূমি দখল ও অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ বন্ধ, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, কথিত মধ্যস্থতাকারী বা দালালচক্রের তৎপরতা তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।দুয়ারীপাড়ার এই জমি বিরোধে এখন মূল বিষয়,কার দাবি সত্য, তা নির্ধারণ করবে আদালতের আদেশ ও সরকারি নথি। আর সেই নথিই পারে দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কলকাতার আগুনে নিভে গেল ৭ বাংলাদেশির প্রাণ, বেনাপোলে ফিরল ৫ মরদেহ—স্বজনদের আহাজারিতে ভারী সীমান্ত

আদালতের স্থিতাবস্থা অমান্যের অভিযোগ, ওয়াকফ জমি রক্ষায় দুয়ারীপাড়ায় মানববন্ধন

আপডেট টাইম : ০৬:০৭:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

সুমন খান:

রাজধানীর রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া বাজারসংলগ্ন প্রায় ৪৮ একর জমি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আইনুদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ স্টেটের কথিত প্লট মালিক ও এলাকাবাসী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাতীয় গৃহায়ন) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, মধ্যস্থতাকারী ও ভূমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জমি বরাদ্দ, দখল, নির্মাণকাজ ও প্লট হস্তান্তরের চেষ্টার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন।

শনিবার অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি থেকে বক্তারা সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত মালিকানা, ওয়াকফ সম্পত্তির আইনগত অবস্থান, আদালতের আদেশ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ প্রক্রিয়া,সবকিছু নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় জমির কোনো ধরনের পরিবর্তন, নির্মাণ বা দখল কার্যক্রম হয়ে থাকলে তা বন্ধ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।আদালতের ‘Status Quo’—কী আছে মামলায়?মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্লট মালিকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল মামলা নং ১৫২১/২০২১ চলমান রয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটিতে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দখল ও অবস্থার ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে।প্লট মালিকদের প্রশ্ন?আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় যদি জমির শ্রেণি, দখল, স্থাপনা কিংবা কাঠামোগত অবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা কীভাবে ঘটল?তাদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি জানা থাকার পরও জমির বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ, দখল ও প্লট নিয়ে লেনদেনের তৎপরতা চলেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ওনথিভিত্তিক সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

৪৮ একর ওয়াকফ সম্পত্তি ঘিরে মূল বিরোধ কোথায়?মানববন্ধনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৮ একর জমি নিয়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ সম্পত্তির বৈধ মোতাওয়াল্লি হিসেবে আবুল কালাম আনসারী জামাল দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের দাবি, জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে বিরোধ চলমান থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নামে জমি বরাদ্দ বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছেন।এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—আদালতে জমির আইনগত অবস্থান নিয়ে মামলা চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে নতুন করে বরাদ্দ বা দখল সৃষ্টির সুযোগ কতটুকু?প্লট মালিকদের দাবি, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মালিকানা বিরোধ নয়; এর সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়নের প্রশ্নও জড়িত।

নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন,মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিরোধপূর্ণ জমির বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরির কাজ হয়েছে বা হচ্ছে। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা ও জমির বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকা উচিত।এ বিষয়ে মামলা নং ৬২/২০২৪-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দিয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে।তবে রাজউকের নোটিশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, সংশ্লিষ্ট ভবনের অনুমোদন, নকশা এবং আদালতের আদেশের সঙ্গে নির্মাণকাজের সম্পর্ক—এসব বিষয় সরকারি নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।ড্যাফোডিল মান্নান ও মোক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ,মানববন্ধনে ড্যাফোডিল মান্নান ও মোক্তার হোসেন নামে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে জমিতে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ তোলা হয়।

প্লট মালিকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে থানায় অভিযোগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নোটিশ দেওয়া হলেও প্রত্যাশিতভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।তবে অভিযোগের বিষয়ে ওই দুই ব্যক্তির বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে লিখিত অভিযোগ, নোটিশ, আদালতের আদেশ এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।সাংবাদিক পরিচয়দানকারী’ ইমনকে ঘিরে নতুন অভিযোগ মানববন্ধন থেকে ইমন নামে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়। প্লট মালিকদের দাবি, তিনি সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ স্টেটের প্রায় ৯০ কাঠা জমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছেন এবং জমি সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন।তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইমনের প্রকৃত পরিচয়, তিনি কোন গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কী নথি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জমি দেওয়ার বিষয়ে তার কোনো বৈধ ক্ষমতা বা দলিল রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।অভিযোগের বিষয়ে ইমনের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন,মানববন্ধনকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো—বিরোধপূর্ণ ওয়াকফ সম্পত্তির জমি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।তাদের দাবি, বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রভাব খাটিয়ে থাকলে কিংবা কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালচক্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট জমির মূল খতিয়ান ও মালিকানা নথি কী বলে।দ্বিতীয়ত, জমিটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে কীভাবে নথিভুক্ত।তৃতীয়ত, আদালতের Status Quo আদেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি কী।চতুর্থত, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বরাদ্দ থাকলে তার তারিখ, স্মারক নম্বর ও আইনি ভিত্তি কী।

পঞ্চমত, বরাদ্দের আগে জমিটির ওপর চলমান মামলা বা আদালতের নির্দেশনা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না।ষষ্ঠত, কোনো ডেভেলপার বা ব্যক্তির নামে জমি হস্তান্তর বা দখলের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে তার বৈধতা কী।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
‘দালালচক্র’,অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি,মানববন্ধনে কথিত, দালালচক্রের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়।

প্লট মালিকদের দাবি, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দিয়ে অর্থনৈতিক লেনদেনে জড়ানোর চেষ্টা করছেন।এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ভূমি বিরোধের বিষয় নয়; প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা অবৈধ লেনদেনের মতো অপরাধের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, চুক্তিপত্র, রসিদ, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা অপরিহার্য।প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি,মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জমির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত অবস্থান নিয়ে বিরোধ থাকলে কোনো পক্ষের প্রভাব বা পরিচয় বিবেচনা না করে প্রশাসনের উচিত নথিপত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা।

তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কেউ যদি জমিতে দখল, নির্মাণ, প্লট বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।এখন সামনে যে প্রশ্নগুলো দুয়ারীপাড়ার এ বিরোধে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আদালতের আদেশের প্রকৃত বিষয়বস্তু, জমির সরকারি ও ওয়াকফ নথি, বরাদ্দের কাগজপত্র এবং নির্মাণ অনুমোদনের বৈধতা।যদি সত্যিই আদালতের Status Quo বহাল থাকা অবস্থায় জমির অবস্থার পরিবর্তন, নতুন নির্মাণ বা দখল হয়ে থাকে, তাহলে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।অন্যদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ যদি বৈধ কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথিও জনসম্মুখে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মানববন্ধনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, অভিযুক্ত ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও আদালতে মামলা চলমান থাকার দাবির কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্লট মালিকরা।তাদের দাবি, আদালতের আদেশ, ওয়াকফ সম্পত্তির নথি, সরকারি বরাদ্দপত্র, ভূমি রেকর্ড, নির্মাণ অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রকাশ্যে এনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করাহোক।মানববন্ধন থেকে ভূমি দখল ও অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ বন্ধ, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, কথিত মধ্যস্থতাকারী বা দালালচক্রের তৎপরতা তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।দুয়ারীপাড়ার এই জমি বিরোধে এখন মূল বিষয়,কার দাবি সত্য, তা নির্ধারণ করবে আদালতের আদেশ ও সরকারি নথি। আর সেই নথিই পারে দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।


প্রিন্ট