আঃ হামিদ, মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধিঃ
টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের গড়গড়িয়া এলাকায় লেক খনন নিয়ে বন বিভাগ ও গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। লেক খনন বন্ধের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার 'সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র জনতা' ব্যানারে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কে পঁচিশ মাইলে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গারোদের প্রথাগত মালিকানাধীন জমিতে লেক খনন এবং মাটি ভরাটের অভিযোগ আনা হয়। জবাবে বন বিভাগ বলছে, খরা মোকাবিলা এবং বন্যপ্রাণির পানীয় জলের সমস্যা নিরসনে সংরক্ষিত বনে লেক খনন হচ্ছে। স্বার্থান্বেষী মহল তাদের দুরভিসন্ধি হাসিলের জন্য এ অপপ্রচার চলছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলের গড়গড়িয়া এলাকায় লেক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। গায়রা গ্রামের কয়েকজন গারো নিম্নাঞ্চলে মাটি ফেলার প্রতিবাদ করায় লেকের দুই পাড়ে এখন মাটি জড়ো করা হচ্ছে। লেক খনন করা জায়গাটি আসলে দুই টিলার মাঝখানের সর্পিল খাল। বর্ষাকালে আশপাশের টিলা আর জঙ্গলের পানি জমে এ লেকে। অতিরিক্ত পানি বাইদ হয়ে বানার নদীতে গিয়ে পড়ে। জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জ অফিস জানায়, 'মধুপুর শালবন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম' এর আওতায় লেক ১ হাজার ১৬৫ ফিট বর্ধিতকরণ হচ্ছে। লেকটি দীর্ঘ হলে বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করতে পারবে। খনন করা নিম্নাঞ্চল বন বিভাগের সংরক্ষিত বন এলাকার। চারপাশে গভীর বন এবং আশপাশে নেই কোন বাড়ি ঘর।
জাউসের ফরেস্ট রেঞ্জার মোশারফ হোসেন জানান, শুস্ক মৌসুমে বনাঞ্চলের বানার নদী, শতাধিক বাইদ, খাল এবং পুকুর শুকিয়ে যায়। তখন খাওয়ার পানির জন্য চারদিকে হাহাকার পড়ে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণির করুণ দশা চোখে পড়ে। বানর, হনুমান ও হরিণসহ সব ধরনের বন্যপ্রাণী খাওয়ার পানির সন্ধানে আশপাশের জনপদে গিয়ে হামলা ও প্রাননাশের শিকার হয়। উন্মুক্ত জঙ্গল ছাড়াও লহুরিয়া বিটের সংরক্ষিত পশু প্রজনন কেন্দ্রে বেশ কিছু হরিণ এবং ২০ জোড়া ময়ূর রয়েছে। প্রজনন কেন্দ্রের পুকুরে অবমুক্ত হয়েছে শ খানেক কাছিম। খরা মৌসুমে এরা পানি সংকটে পড়ে। ৬৬৫ ফিট দীর্ঘ গড়গড়িয়া লেক খনন হয় পাঁচ দশক আগে। সেটিও অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকেনা বললেই চলে। খরা মৌসুমে প্রাণিকূলের পানির সহজলভ্যতার জন্য গড়গড়িয়া লেক সম্প্রসারণ হচ্ছে। কিন্তু সরকারি জমিতে, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়াচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু গারো সম্প্রদায়ের যুবক। তারা তাদের প্রথাগত ভূমি মালিকানার দাবি তুলে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। কিন্তু গড়গড়িয়া এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন ভূমি নেই। বনের জমিতেই খননকৃত মাটি ফেলা হচ্ছে।
সামাজিক বনায়নের সহব্যবস্থপনা কমিটির সভাপতি মোত্তালেব হোসেন জানান, বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সহজে পানি মেলে না। এক সপ্তাহ আগে লেক খনন উদ্ধোধনকালে গারো নেতারা উপস্থিত ছিলেন। যেখানে লেক খনন হচ্ছে, সেখানে গারোদের জমিজমা বা বাড়িঘর নেই। তারপরও অযথা নিজেদের ভূমি দাবী করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব জানান, লেক সম্প্রসারণ ছাড়াও বনাঞ্চলের হাজামজা ১০টি পুকুর সংস্কার হচ্ছে। এতে বন এলাকায় পানি সংকট দূর হবে। বনবাসী ছাড়াও বন্য প্রাণিকূল সহজেই খাওয়ার পানি পাবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিরুদ্ধে কেন তারা আন্দোলন করছে বুঝতে পারছেন না।
বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের সম্পাদক অলিক মৃ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম এক বক্তব্যে জানান, বন বিভাগ এর আগে দোখলা রেঞ্জের চুনিয়া মৌজায় গারোদের আবাদী জমি দখল করে কৃত্রিম লেক খননের চেষ্টা চালায়। আন্দোলনের মুখে বন বিভাগ পিছু হটে। তাদের দাবি-গড়গড়িয়া লেক ও এর আশপাশের ভূমি গারোদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। সেখানে তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার রয়েছে। তাই নতুন করে লেক সম্প্রসারণকে তারা অবৈধ মনে করছেন।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মোহসিন জানান, সংরক্ষিত বনে কখনো কারো কোনো প্রথাগত ভূমি অধিকার থাকে না। গারোদের জমিতে লেক খনন হচ্ছে না। সুতরাং স্বার্থান্বেষী মহলের ইঙ্গিতে গারো যুবকদের একটি অংশ উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24