
স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই সামনে চলে আসে ধ্বংসস্তূপ, বিস্ফোরণ, রক্তাক্ত মানুষ, মরদেহ। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম থেমে থাকে না—আর আমাদের মনও ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ, গাজা স্ট্রিপ–এর ধ্বংসযজ্ঞ বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে ভিডিও ও পোস্ট তরুণ-তরুণীদের মধ্যে তীব্র আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি বুঝতে পারছি, এই ভার্চুয়াল যুদ্ধ আমাদের মানসিক জগতে কী করছে?
গবেষণা কী বলছে?
১. পরোক্ষ ট্রমা বা “Vicarious Trauma”: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা বলছে, বারবার সহিংস ভিডিও ও ছবি দেখলে মস্তিষ্ক বাস্তব বিপদের মতোই প্রতিক্রিয়া দেখায়। এতে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, হৃদস্পন্দন বাড়ে, উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়।
২. শিশুদের ওপর প্রভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানায়, যুদ্ধ বা সহিংসতার দৃশ্যের নিয়মিত এক্সপোজার শিশুদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন, আচরণগত পরিবর্তন এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৯ সালে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স উল্লেখ করে যে, সহিংস মিডিয়া কনটেন্ট শিশুদের মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের ছাপ ফেলতে পারে।
৩. তরুণদের মধ্যে “ডুমস্ক্রলিং” প্রবণতা: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত নেতিবাচক সংবাদ স্ক্রল করার অভ্যাস—যাকে “ডুমস্ক্রলিং” বলা হয়—ডিপ্রেশন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ায়।
কেন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেশি?
ভিডিও কনটেন্ট বেশি ইমোশনাল। অ্যালগরিদম বারবার একই ধরনের পোস্ট দেখায়। মন্তব্য ও রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে আবেগ আরও তীব্র হয়। বাস্তবতা ও ভার্চুয়াল দৃশ্যের সীমা মুছে যায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান। ফলে সহিংস দৃশ্য তাদের মানসিক ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
আপনি কি এই লক্ষণগুলো অনুভব করছেন?
অকারণে দুশ্চিন্তা, ঘুমে সমস্যা বা দুঃস্বপ্ন, বিরক্তি ও অস্থিরতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া থাকতে না পারা—এই লক্ষণগুলো থাকলে এখনই সতর্ক হোন।
এখনই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন—কীভাবে?
১. স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন: দিনে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া খবর বা যুদ্ধসংক্রান্ত পোস্ট দেখবেন না। ২. “নো-ভিডিও” নীতি নিন: সহিংস ভিডিও দেখবেন না। প্রয়োজনে কনটেন্ট মিউট বা আনফলো করুন। ৩. শিশুদের জন্য প্যারেন্টাল কন্ট্রোল: অভিভাবকদের উচিত শিশুদের ফিড মনিটর করা এবং সহিংস কনটেন্ট থেকে দূরে রাখা। ৪. বাস্তব সংযোগ বাড়ান: বন্ধু, পরিবার, প্রকৃতির সাথে সময় কাটান। বাস্তব হাসি ভার্চুয়াল আতঙ্ককে দুর্বল করে। ৫. মাইন্ডফুল ব্রিদিং: প্রতিদিন ১০ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন উদ্বেগ কমাতে কার্যকর।
মনে রাখবেন বিশ্বের সব যুদ্ধ আপনার কাঁধে নয়। আপনার দায়িত্ব—নিজের মনকে সুস্থ রাখা। যুদ্ধের খবর জানা জরুরি, কিন্তু নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা আরও জরুরি। কারণ ভেঙে পড়া মন দিয়ে পৃথিবী বদলানো যায় না।
কখন পেশাদার সাহায্য নেবেন?
দুই সপ্তাহের বেশি মন খারাপ, আতঙ্ক বা প্যানিক অ্যাটাক, আত্মহানির চিন্তা কিংবা শিশুদের আচরণে বড় পরিবর্তন—এই অবস্থায় অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24