হোয়াইট হাউসে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে সহায়তার করতে ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করায় তিনি হোয়াইট হাউসে রোষানলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, জাপানের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও রক্ষণশীল নেতা তাকাইচিকে শুরু থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এমনকি সম্প্রতি জাপানের নির্বাচনে তাকাইচির ভূমিধস জয়ের আগেও তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে বর্তমানে তাকাইচিকে এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরান ও ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় তেহরান গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এটি পুনরায় সচল করতে ওয়াশিংটন তার এশীয় ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু তারা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় মিত্রদের ওপর চটেছেন ট্রাম্প।
তাকাইচি যেমন একদিকে ট্রাম্পকে চটাতে চাইছেন না, তেমনি তাকে জাপানের শান্তিবাদী সংবিধানের সীমাবদ্ধতাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। একইসঙ্গে এই যুদ্ধের সঙ্গে জাপানের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও দেশটির অর্থনীতি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বুধবার জাপানের পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেন, ‘জাপানের আইন অনুযায়ী আমরা যা করতে পারি, তা অবশ্যই করব। কিন্তু যা করা সম্ভব নয়, তা আমরা করব না। আমি বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই।’
তবে ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্প ইতোমধ্যেই জাপানকে সেই দেশগুলোর তালিকায় রেখেছেন, যারা তাকে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ন্যাটো দেশগুলোর সহায়তার আমাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই, বা আমরা তা চাইও না- কখনো প্রয়োজন ছিলও না! একইভাবে জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও তাই।’
জাপানে বিদেশের মাটিতে ‘সেলফ ডিফেন্স ফোর্স’ বা আত্মরক্ষা বাহিনী পাঠানো রাজনৈতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল বিষয়। কারণ দেশটির অনেক ভোটারই মার্কিন চাপে প্রণীত ১৯৪৭ সালের শান্তিবাদী সংবিধান সমর্থন করেন, যেখানে যুদ্ধকে বর্জন করা হয়েছে।
তবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান বর্তমানে তেলের পঞ্চম বৃহত্তম আমদানিকারক। দেশটির ৯৫ শতাংশ তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং এর ৭০ শতাংশই পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
গত অক্টোবর মাসে ট্রাম্প যখন টোকিও সফর করেন, তখন তাকে বেশ মুগ্ধ করেছিলেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। এমনকি ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার কথাও বলেছিলেন তিনি।
এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তাকে ‘শক্তিশালী, ক্ষমতাধর ও বিজ্ঞ’ নেতা হিসেবে অভিহিত করে সমর্থন দেন।
তবে গত সপ্তাহে প্রকাশিত জনমত জরিপ বলছে, তাকাইচি প্রশাসনের ওপর জনগণের তুষ্টির দিন শেষ হয়ে আসছে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাভিশ্বাস উঠছে।
তা সত্ত্বেও ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করার ভয়ে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের সরাসরি কোনো সমালোচনা করেননি তাকাইচি।
টোকিও কোনোভাবেই ট্রাম্পকে চটাতে চায় না, কারণ দশকের পর দশক ধরে জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। জাপানের মাটিতে বর্তমানে ৬০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে মার্কিন নিরাপত্তা বলয় জাপানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তাইওয়ানে চীনের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা হলে জাপান তাতে বাধা দিতে পারে- গত নভেম্বরে তাকাইচির এমন মন্তব্যের পর থেকে বেইজিংয়ের সঙ্গে টোকিওর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
এদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর থেকে ওয়াশিংটন নজর সরিয়ে নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আগামী ৩১ মার্চ বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি বৈঠক নির্ধারিত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি তদারকির কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প সেই সফর স্থগিত করায় উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে ইরান পরিস্থিতি সবার মনোযোগ কাড়ছে। তবে ইরানের বাইরের অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতিও বেশ জটিল। আমরা আশা করছি, এই সফরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়েও আলোচনা হবে।’
জাপান বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পকে কাছে টানার চেষ্টা করবে। গত বছর ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি পাওয়ার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে টোকিও।
বুধবার তাকাইচি আরও বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দূরবর্তী দ্বীপে ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ আহরণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়েও তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের সায়ুরি রোমেই এএফপি’কে বলেন, ‘সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জন্য বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার সেরা পথ হলো জাপানকে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা।’
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24