ডোরহীন বাঁধনঃ-মাধুরী ব্যানার্জীঃ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিনই দেখা হতো বৃদ্ধা কমলাদেবী আর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে তিথির। বাসস্ট্যান্ডের এক কোণে বসে কমলাদেবী ফুল বিক্রি করতেন। তিথি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে তাঁর কাছ থেকে একটি করে জুঁইফুল কিনত।
একদিন কমলাদেবী বললেন, — "মা, তুই তো প্রতিদিন ফুল কিনিস, কিন্তু নিজের জন্য নয় কেন?"তিথি হেসে উত্তর দিল, — "মা নেই। বাবার ছবির সামনে রেখে যাই। মনে হয় উনিও গন্ধটা পান।"সেদিন থেকে কমলাদেবীর চোখে তিথি আর সাধারণ ক্রেতা রইল না। প্রতিদিন সে ফুলের সঙ্গে একটি বাড়তি ফুল গুঁজে দিত। তিথিও মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে টিফিনের লুচি কিংবা নাড়ু এনে দিত।কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, কোনো আত্মীয়তার পরিচয়ও নয়। তবু দুজনের অপেক্ষা যেন প্রতিদিন একে অপরকে ঘিরেই থাকত।
একদিন টানা তিন দিন তিথি এল না। কমলাদেবী অস্থির হয়ে উঠলেন। চতুর্থ দিনে জানতে পারলেন, তিথি ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি।নিজের সামান্য সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা নিয়ে তিনি হাসপাতালে পৌঁছালেন। তিথির বাবা বিস্ময়ে বললেন, — "আপনি?"কমলাদেবী শুধু মৃদু হেসে বললেন, — "আমি ওর কেউ নই... তবু মনে হলো, না এলে মনটা শান্তি পাবে না।"সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর তিথি দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। কমলাদেবীর কাঁপা হাত আশীর্বাদের মতো নেমে এল তার মাথায়।
সেদিন বাসস্ট্যান্ডে কেউ বুঝতে পারেনি— সম্পর্কের জন্য সব সময় রক্তের দরকার হয় না। কিছু বন্ধন জন্ম নেয় মমতায়, বিশ্বাসে আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। সেই বন্ধনের কোনো সুতো থাকে না, কোনো নাম থাকে না; তবু সেটাই হয় সবচেয়ে শক্ত, সবচেয়ে স্থায়ী।ডোরহীন বাঁধন— এভাবেই মানুষের হৃদয়কে অদৃশ্য এক সেতুতে চিরকাল বেঁধে রাখে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24