স্টাফ রিপোর্টার: মোঃ আব্দুল আজিজ মিয়া
কুড়িগ্রামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান, বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—তা যাচাইয়ে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনের সময় শুধু কাজের অগ্রগতিই নয়, অনুমোদিত নকশা, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, কারিগরি স্পেসিফিকেশন এবং নির্মাণসামগ্রীর মানসহ প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্প নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন হচ্ছে কি না, কাজের পরিমাণে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত নকশা ও কারিগরি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না—এসব বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, জেলার নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় যোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে কি না, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না এবং প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল জনগণ পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ও মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নকশা ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল
মাঠপর্যায়ের তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের সামঞ্জস্য যাচাই। প্রকল্পের কাগজপত্রে যে ধরনের কাজ, যে পরিমাণ এবং যে মানের উপকরণ ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল রয়েছে কি না—তা পর্যবেক্ষণ করছেন প্রকৌশলীরা।
বিশেষ করে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে রাস্তার প্রস্থ, উচ্চতা, মাটির কাজ, বেড প্রস্তুত, বিভিন্ন স্তরে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান এবং নির্ধারিত পুরুত্বসহ কারিগরি বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। একইভাবে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে রড, সিমেন্ট, বালু, পাথর, কংক্রিটসহ বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার এবং নির্মাণপ্রক্রিয়া নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর মানে বিশেষ নজর
উন্নয়ন প্রকল্পের স্থায়িত্ব অনেকাংশেই নির্মাণসামগ্রীর মান ও কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে নির্মাণসামগ্রীর মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকৌশলীদের মতে, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা অনুমোদিত স্পেসিফিকেশনের বাইরে গিয়ে কাজ করা হলে শুরুতে প্রকল্পটি দৃশ্যত সম্পন্ন হলেও অল্প সময়ের মধ্যে সড়ক, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামোয় বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এতে একদিকে যেমন জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে, অন্যদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর স্থায়িত্ব কমে যায়।
তাই কাজ চলাকালীন পর্যায়েই ত্রুটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতি ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সময়মতো কাজ শেষ করার বিষয়েও নজরদারি
শুধু কাজের মান নয়, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে থাকলে এর কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাজের গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বর্ষা, নদীভাঙন, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে সমস্যা কিংবা অন্য কোনো বাস্তব প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্য
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্প শেষ দেখানোই যথেষ্ট নয়। জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামো যেন টেকসই, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে কারিগরি পরিদর্শন ও তদারকি করা হচ্ছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনুমোদিত নকশা, প্রাক্কলন ও কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করা হচ্ছে। কাজের কোনো পর্যায়ে ত্রুটি, অসঙ্গতি বা নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের তদারকির মূল উদ্দেশ্য হলো উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। কোনো প্রকল্পের কাজে সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রামে টেকসই অবকাঠামোর গুরুত্ব বেশি
কুড়িগ্রাম দেশের অন্যতম নদীবেষ্টিত ও বন্যাপ্রবণ জেলা। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিবছর বন্যা, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির প্রভাব পড়ে। ফলে এখানকার সড়ক, কালভার্ট, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য নয়, প্রকৌশলগত সক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, দুর্বল বা নিম্নমানের নির্মাণকাজ হলে বর্ষা ও বন্যার সময় দ্রুত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং জরুরি রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব
কুড়িগ্রামের অর্থনীতি অনেকাংশেই কৃষিনির্ভর। প্রত্যন্ত গ্রামের সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকলে কৃষকরা উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সহজে স্থানীয় ও আঞ্চলিক বাজারে নিতে পারেন। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ে।
অন্যদিকে যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল হলে কৃষক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাইকে বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। ফলে এলজিইডির আওতায় বাস্তবায়িত গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে শুধু নির্মাণকাজ হিসেবে দেখলে হবে না; এগুলোর সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—তদারকি যেন থাকে নিয়মিত
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কাজের মান যাচাই করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বাড়ে। তবে শুধু প্রকল্প চলাকালীন নয়, কাজ শেষ হওয়ার পরও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর কোনো সড়ক, কালভার্ট বা সেতুতে সমস্যা দেখা দিলে সেটির কারণও খতিয়ে দেখা উচিত। প্রকল্পের তদারকি, নির্মাণের মান যাচাই এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে দেখলে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া সম্ভব।
অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ যাচাইয়ের দাবি
উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কোথাও অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ কিংবা প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, কোনো অভিযোগকে পূর্বধারণার ভিত্তিতে সত্য বা মিথ্যা না ধরে প্রকৌশলগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা উচিত।
এতে একদিকে যেমন নির্দোষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অযথা হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে প্রকৃত অনিয়ম থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জরুরি
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করে পরিকল্পনা, নকশা, প্রাক্কলন, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং তদারকির প্রতিটি ধাপের সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। কোনো একটি ধাপে দুর্বলতা থাকলে পুরো প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল ব্যাহত হতে পারে।
এ কারণে এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও নিয়মিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ‘কাজ হয়েছে’—এই হিসাবের চেয়ে ‘কাজ কতটা মানসম্মত ও টেকসই হয়েছে’—এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি অর্থে নির্মিত একটি সড়ক বা সেতু দীর্ঘদিন জনগণের কাজে না এলে সেই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।
নজরদারি বাড়লে কমবে অনিয়মের ঝুঁকি
মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি থাকলে কাজের শুরুতেই সম্ভাব্য ত্রুটি শনাক্ত করা সম্ভব। এতে কাজ শেষ হওয়ার পর বড় ধরনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন কমে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্ধারিত মান বজায় রেখে কাজ করতে আরও সচেতন হয়।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় এলজিইডির চলমান উন্নয়নকাজে এই তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে তারা চান, উন্নয়ন প্রকল্পের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
সর্বোপরি, কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এলজিইডির প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব অনেক। তাই প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্প যেন নির্ধারিত নকশা, প্রাক্কলন ও কারিগরি নির্দেশনা মেনে টেকসই ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24