নিজস্ব প্রতিবেদক: গণমাধ্যমের ওপর সরকার কোনো অন্যায় পদক্ষেপ নিলে দল-মত বিবেচনা না করে তার প্রতিবাদ করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকরা। একই সাথে বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সাথে দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান সম্পাদকদের নতুন সংগঠন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে, কোনো দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর আস্তে আস্তে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে সরকার। যদিও আমরা আশা করছি, বর্তমান সরকার তেমন হবে না। তবে যদি কোনো গণমাধ্যমের ওপর সরকারি কোনো অন্যায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে সেটি সেই গণমাধ্যম বিরোধী দলকে সমর্থন করে কি করে না— তা বিবেচনা না করেই যেন বিরোধী দল তার প্রতিবাদ করে। বিরোধী দলের নেতা এই কাজে পাশে থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা মিডিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তিনি বলেছেন যে তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করছেন এবং তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। তো সেই সঙ্গে তারা কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের মনঃকষ্টের কথা জানিয়েছেন। যেমন তারা বলেছেন যে তারা জ্বালানি নিয়ে একটা বিশেষ অধিবেশন করতে চেয়েছিলেন। সরকার থেকে এখন পর্যন্ত সেটার সাড়া দেয়নি। তারপরেও তারা এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে চান এবং পার্লামেন্টকেই সব কর্মকাণ্ডের মূল জায়গা করতে চান।
তিনি বলেন, সম্পাদকদের মধ্য থেকে আমরা বলেছি যে, জুলাই বিপ্লবের পরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে। মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরে এসেছে এবং আমরা বলেছি যে আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। আমরা আমাদের মিডিয়ার মেইনস্ট্রিম দায়িত্ব প্রফেশনালি আমরা পালন করবো।
তিনি আরও বলেন, আরেকটা বিষয়ে আমার তরফ থেকে একটা পরামর্শ ছিল। আমি শ্যাডো ক্যাবিনেট তৈরি করার কথা বলেছিলাম। আমি ওনাদেরকে বলেছি যে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটা অভ্যাস বা চরিত্র আছে যে তারা সব বিষয়ে কথা বলেন। তো বিরোধী দলের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা হলো যে সবাই সব বিষয়ে কথা না বলে যদি শ্যাডো কবিনেটটা করা যায়, তাহলে যেমন জনগণের জন্য ভালো হয়, তেমনি সরকারও সবসময় একটা চাপের মধ্যে থাকে। আর বিরোধী দলের জন্য এক ধরনের ট্রেনিং হয়ে যায়। কারণ আমরা জানি যে বিরোধী দল মানে কী। আগামী নির্বাচনে যদি জনগণ তাদের ভোট দেয়, তারা সরকারে যেতে পারে। তো শ্যাডো ক্যাবিনেট হলে পরে তাদের ট্রেনিংটাও হয়ে যায়। তিনি (বিরোধী দলীয় নেতা) এটাকে এপ্রিশিয়েট করেছেন এবং জানিয়েছেন যে একটা শ্যাডো ক্যাবিনেট তারা ইতোমধ্যে করে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদেরকে জানান নাই। সেই শ্যাডো ক্যাবিনেটের নাকি প্রশিক্ষণ চলছে এবং অল্পদিনের মধ্যেই তিনি আমাদেরকে জানাবেন।
সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, সভায় মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান জানতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি (বিরোধী দলীয় নেতা) বলেছেন যে, প্রতিবেশী তো প্রতিবেশী। একটা প্রতিবেশীর সঙ্গে আরেক প্রতিবেশীর যেমন সম্পর্ক থাকে, তারা ওই সম্পর্কই চান। এত বেশিও না যে বাংলাদেশের সবকিছু উজাড় করে দিতে হবে। আবার সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে যেন কোনো শত্রুতাও না থাকে।
মতবিনিময় সভা শেষে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেই তো সরকার। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমাদেরকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। আমরা এসেছিলাম। তারা মিডিয়া সম্পর্কে খুবই সুন্দর কথা বলেছেন। মিডিয়ার ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আমরা আমাদের পরামর্শ দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমি একটা বিষয়ে তাদেরকে অনুরোধ করেছি যে, এদেশে আমরা একটা ফ্যাসিবাদী পর্যায় অতিক্রম করে এসেছি। আরেকটা পর্যায় আমরা অতিক্রম করে এসেছি যে, নির্বাচিত সরকারের আমলে বিরোধী দলের নামে নৈরাজ্য হয়েছে আন্দোলনের নামে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে পার্লামেন্টের ভেতরে থাকতে হবে। সরকারকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের ধারার মধ্যে থাকতে হবে, যাতে ফ্যাসিবাদ এবং বিরোধীদলীয় নৈরাজ্য কোনোটাই ফিরে না আসে— এই আহ্বান আমরা জানিয়েছি।
দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, মতবিনিময় সভায় জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা প্রথমে একটু স্পিচ দিয়েছেন। সম্পাদকদের পক্ষ থেকে অনেকে কথা বলেছেন। একটা প্রাণবন্ত ডিসকাশন হয়েছে এবং সবাই প্রাণ খুলে কথা বলেছেন। বিরোধী দল কী করছে এবং তাদের কী করা উচিত— মানে কনস্ট্রাক্টিভ কিছু ক্রিটিসিজম এবং অ্যাডভাইস পুরোটাই আলোচনায় ছিল।
জামায়াত আমির এই সরকারের প্রথম ছয় মাসে তাদের পারফরমেন্স, সরকারের পারফরমেন্স, মিডিয়া ফ্রিডমের কথা বলেছেন। বাংলাদেশে এখনো সেই সত্যিকার অর্থে মিডিয়া ফ্রিডম আসেনি, জুডিশিয়াল ফ্রিডমেও কিছু ব্যর্থ হয়েছে— সেগুলোর কথা বলেছেন। আর তিনি তার দলের পারফরমেন্সের উপরে হাইলাইট করেছেন।
আর সম্পাদকদের তরফ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, আমরা এর আগে দেখেছি যে সরকার ফেল করেছে। আওয়ামী লীগ একটা মনস্টার হয়ে গিয়েছিল। একটা ফ্যাসিস্ট, অটোক্রেটিক সরকার ইস্টাবলিশ করে তারা বিরোধী দলের কোনো স্পেসই রাখেনি, রাজনীতিই করতে দেয়নি। তেমনি আগে বিরোধী দলও যে খুব দায়িত্বশীল আচরণ করেছে তা-না। বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের পার্লামেন্টকে দাঁড়াতেই দেয়নি। তারা কথায় কথায় ওয়াকআউট করেছে। কথায় কথায় হরতাল ডেকেছে। ফলে বাংলাদেশে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের যে আচরণ করার কথা, সেটা তেমন একটা হয়নি। সবাই এ বিষয়ে বলেছেন যে, পার্লামেন্ট যাতে সেন্টার অফ অল অক্টিভিটিস হয়। পার্লামেন্ট যাতে ট্রুলি বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে। এ বিষয়ে প্রত্যেক সম্পাদক একইভাবে সুরে কথা বলেছেন।
শফিকুল আলম বলেন, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কে বা উনাদের একজন ল মেকারের সম্পর্কে বলেছেন যে, কিছুদিন আগে তাদের পক্ষ থেকে প্রথম আলো বয়কটের কথা বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবমিলিয়ে বাংলাদেশে খুব পারফেক্ট না হলেও মিডিয়া ফ্রিডম এখন ভালো অবস্থায় আছে। আমি দেখেছি যে, সেটা নিয়ে সবাই এক ধরনের স্যাটিসফ্যাকশনে আছেন।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24