১ হাজার কোটি টাকার আরআরপি প্রজেক্ট ভেস্তে দেওয়ার পাঁয়তারা, নেপথ্যে জামাল উদ্দিনের চুক্তি লঙ্ঘন ও নান্নু সিন্ডিকেট
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী মৌজায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি মেগা শিল্প প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সাবেক কর্মকর্তার যোগসাজশে এক বিশাল জালিয়াতি, চুক্তি লঙ্ঘন ও জমি গ্রাসের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও আইনি প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্প্রতি রাতের আঁধারে বিতর্কিত জমিতে ভুয়া মালিকানার সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে এই প্রভাবশালী চক্র। মামলার বাদী ও বিশিষ্ট ঠিকাদার মো: মাসুদ রানা পারভেজ-এর সাথে জমির বায়না চুক্তি করে পরবর্তীতে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা, দফায় দফায় প্রাণঘাতী হামলা এবং ১১৬১ নং খতিয়ানের জমি জবরদখলের এই ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বর্তমানে এই বিরোধ নিয়ে বিজ্ঞ আদালতে পিটিশন-২১০/২৬ নম্বরে মামলা ১৪৪/১৪৫ ধারায় বিচারাধীন রয়েছে।
রাতের আঁধারে ঝুলানো সাইনবোর্ডের নেপথ্য কাহিনী:
সরেজমিনে ও প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যায়, কাটাবাড়ী মৌজার ওই বিতর্কিত ১৮ শতক জমিতে রাতের আঁধারে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে লেখা রয়েছে— “বায়না সূত্রে এই জমির মালিক মো: দুদু মিয়া, মোবা: ০১৭১৩৭৭১৭১১, মৌজা: কাটাবাড়ী, জমির পরিমাণ ১৮ শতক, জমি বিক্রয় করা হইবে।”
ভুক্তভোগী ও মামলার বাদী মাসুদ রানা পারভেজের অভিযোগ, বিবাদী পক্ষ জমিটি নিয়ে বিজ্ঞ আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা বলবৎ থাকা সত্ত্বেও আইনকে তোয়াক্কা না করে রাতের অন্ধকারে এই সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে। বায়নানামা দলিলের মাধ্যমে জমির চূড়ান্ত মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তরিত না হওয়া সত্ত্বেও এবং মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এভাবে জমি বিক্রির সাইনবোর্ড ঝুলানো সরাসরি আদালত অবমাননা (Contempt of Court) এবং জালিয়াতির শামিল।
১ হাজার কোটি টাকার আরআরপি প্রজেক্ট ও জমির জটিলতা:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরদী পাবনার হেড অফিস সম্বলিত দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘আর-আর-পি (R-R-P) গ্রুপ কোম্পানি’ কাটাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২০০ গজ দূরে দিনাজপুর হাইওয়ে রোড সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পোল্ট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, ফিশ মিল, ফিড মিল ও মাছের হ্যাচারিসহ একটি বিশাল প্রজেক্ট এবং একই সাথে পেট্রোল পাম্প, মেডিকেল কলেজ ও সিএনজি স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রজেক্টের চারদিকের বাউন্ডারিসহ সিংহভাগ কাজ শেষ হলেও মূল গেট হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাস্তার সামনের ৩৬ শতক জমির একাংশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
তফসিল অনুযায়ী, কাটাবাড়ী মৌজার জেএল নং- ৮৮, বিআরএস খতিয়ান নং- ১১৬১ (খারিজ খতিয়ান নং- ২০২৬-১০০০০০)-এর ৮৬৩৫, ৮৬১২, ৮৬১৩ ও ৮৬৩৮ দাগের মোট দশমিক ০৩৪৫০০ একর জমির মধ্যে ৮৬৩৫ দাগে মূলত ১৮ শতক জমি রয়েছে। এই জমিটির মূল ওয়ারিশ ছিলেন ৪ ভাই— আতাবর, জামাল, কামাল ও বাবু। বড় ভাই আতাবর নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার পর তিন ভাই জামাল, কামাল ও বাবু ওয়ারিশ সূত্রে জমিটির মালিক হন। কিন্তু মেজো ভাই বিবাদী মো: জালাল উদ্দিন অন্যান্য ওয়ারিশ ও মৃত ভাইয়ের স্ত্রীদের সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এককভাবে জমিটি নিজের নামে খারিজ করে জালিয়াতির মাধ্যমে আরআরপি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেন।
বায়না চুক্তি অস্বীকার ও সাবেক তহসিলদার জাফর আলী দুর্নীতি:
নথিপত্র ও অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, এই বিতর্কিত জমিটি নিয়ে পূর্বে মামলার বাদী মাসুদ রানা পারভেজের সাথে বিবাদী মো: জামাল উদ্দিনের একটি আইনসংগত বায়না চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। মাসুদ রানা চুক্তি অনুযায়ী যথানিয়মে লেনদেন করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ইন্ধনে বিবাদী জালাল উদ্দিন সেই বায়না চুক্তি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং জমিটি অন্য জায়গায় হস্তান্তরের পাঁয়তারা শুরু করেন।
বিগত ৭-৮ বছর ধরে চলা এই জটিলতার মূল হোতা ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সাবেক উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) । এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে মৃত আতাবরের নামের অংশ বিষয়টি গোপন করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিবাদী জামাল উদ্দিনের নামে নামজারি বা খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে এই দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হলে তৎকালীন ভূমি কমিশনার (এসি ল্যান্ড) এই অবৈধ খারিজটি বাতিল করে দেন। কিন্তু ভূমি অফিসের দালাল ও তৎকালীন তহসিলদার জাফর আহমেদ ও মো: আজিজ নামের এক ব্যক্তির ইন্ধনে জালিয়াতির চক্রটি থামেনি।
ব্যর্থ আপস-মিমাংসার বৈঠক ও নান্নু মিয়ার চাঁদাবাজি:
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৬/০৫/২০২৬ইং তারিখে কাটাবাড়ী বাগদা বাজারস্থ মামলার বাদী মাসুদ রানার বাসভবনে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে একটি আপস-মিমাংসার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২ নং কাটাবাড়ী সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান মো: দিদারুল হক প্রধান, মো: তাজুল ইসলাম, মোছা: মজিদা আক্তার ও মার্জিনা বেগমসহ স্থানীয় ২০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, আরআরপি কোম্পানির কাছ থেকে পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী জমির প্রাপ্ত হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে বিরোধটি মিটিয়ে ফেলা হবে। তবে সে বৈঠক ও ভেস্তে দেয়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নাম ভাঙিয়ে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও সিন্ডিকেট প্রধান মো: নান্নু মিয়া (পিতা: মৃত আলাউদ্দিন, যার বিরুদ্ধে পলাশবাড়ী থানায় ২টি নাশকতা মামলা রয়েছে), মো: জালাল উদ্দিন সহ ১০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা আরআরপি কোম্পানির ডিরেক্টর ও ম্যানেজারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় জোরপূর্বক প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা চাঁদাবাজি করে পকেটে ভরে এবং সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে গরু-ছাগল, খামার ও বাড়ি দিবে বলে কৌশলে টাকা নেয় পরবর্তীতে আর ফেরত দেয়নি। এই নান্নু মিয়া ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি চেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে বাদীর মানিব্যাগ ও স্মার্ট কার্ডসহ সবকিছু ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগে প্রকাশ।
ধারাবাহিক হামলা ও বর্তমান অবস্থা:
এই চক্রটির জালিয়াতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই ও মামলা চালিয়ে যাওয়ায় ঠিকাদার মাসুদ রানা পারভেজের ওপর একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে। প্রথমে রাজশাহীর পুঠিয়া এলাকায় তাকে অপহরণ করে ব্যাংকের দুটি খালি চেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়, যার তদন্ত করছে পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ADM)। এরপর গত ২৬ জুলাই গোবিন্দগঞ্জের কাটাবাড়ী রোডস্থ স’ মিলের সামনে ও ইউনিয়ন পরিষদের বিপরীতে মাদক সিন্ডিকেট দুর্গা রানী ও নান্নু মিয়ার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাসুদ রানার ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনতাই করা হয়। বর্তমানে এই হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই রাতের আঁধারে মো: দুদু মিয়ার নাম ব্যবহার করে বিতর্কিত জমিতে ভুয়া সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হলো।
বাদীর বক্তব্য ও প্রশাসনের আশ্বাস:
মামলার বাদী মাসুদ রানা পারভেজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "১১৬১ নং খতিয়ানের এই জমিটি নিয়ে আমাদের সাথে বায়না চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও জামাল উদ্দিন এখন তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন। সাবেক তহসিলদার জাফরের দুর্নীতি এবং জামাল ও নান্নু মিয়ার এই সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট ১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রজেক্টকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি করছে বিভিন্ন সময়। তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতের আঁধারে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে। আমি জেলা প্রশাসক (DC), ইউএনও (UNO) এবং গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসির কাছে এই ৭ বছরের পুঞ্জীভূত অপরাধের দ্রুত অবসান, ভুয়া সাইনবোর্ড উচ্ছেদ এবং আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।"
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে এই বিশাল জালিয়াতি, চুক্তি ভঙ্গ, রাতের আঁধারে সাইনবোর্ড স্থাপন ও চাঁদাবাজি চক্রের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24