জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে যাত্রা শুরু করে কাস্টমস হাউস আইসিডি, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৯টি বেসরকারি অফডক বা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) খালাস হওয়া প্রায় ৬৫ ধরনের আমদানি পণ্যের শুল্কায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই সংস্থাকে। পাশাপাশি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের শতভাগ আমদানি-রপ্তানি পণ্য এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যাওয়া দেশের শতভাগ রপ্তানি চালানের শুল্কায়নের দায়িত্বও রয়েছে এই কমিশনারেটের ওপর।
বিশাল এই কর্মপরিধির বিপরীতে অনুমোদিত পদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে দপ্তরটি চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বিল অব এন্ট্রি ও শিপিং বিল জমা পড়ছে। এসব নথি যাচাই-বাছাই, মূল্য নির্ধারণ ও শুল্কায়নের কাজ করতে গিয়ে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ নিতে হচ্ছে। অনেককে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরও দীর্ঘ সময় অফিসে অবস্থান করে কাজ সামলাতে হচ্ছে।চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কাজের চাপ কমাতে এবং শুল্কায়নে গতি আনতে ‘কাস্টমস হাউস আইসিডি, চট্টগ্রাম’ চালু হলেও মাত্র এক মাসের মাথায় এটি তীব্র জনবল সংকটে পড়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ জনবল নিয়ে অফডকের ৬৫ ধরনের আমদানি পণ্য, বিমানবন্দরের শতভাগ পণ্য এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সকল রপ্তানি চালানের বিশাল কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা, যার ফলে তৈরি হচ্ছে ফাইলজট
কাস্টমস হাউসের এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (চট্টগ্রাম চেম্বার) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, “এখানে কেবল জনবল সংকটই নয়, দক্ষ লোকবলেরও অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ায় এক সেমিনারে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে জানলাম— আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশের কাস্টমস হাউসগুলোও এখন সম্পূর্ণ ‘পেপারলেস’ ও ‘ফেইসলেস’, অর্থাৎ পুরোটাই প্রযুক্তিনির্ভর।”
তিনি আরও বলেন, ‘অথচ আমাদের কাস্টমস হাউস এখনও এআরও (সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা) নির্ভর। মূল গলদটা নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কাস্টমস ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ হলে ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ বন্ধ হবে, দুর্নীতিও কমবে। এজন্য দ্রুত প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো ও দক্ষ লোকবল নিয়োগ দিতে হবে।’
চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ জাম্বুরি পার্ক-সংলগ্ন বিএসটিআই ভবনের ষষ্ঠ তলা ভাড়া নিয়ে শুরু হয়েছে কাস্টমস হাউস আইসিডির কার্যক্রম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়টিতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের ভিড়। কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা ফাইল সামলাতে ব্যস্ত, টেবিলে জমে আছে নথির স্তূপ। ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা জানান, আগে পরিবেশ শান্ত থাকলেও নতুন কাস্টমস হাউসের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে লোকজনের যাতায়াত বহু গুণ বেড়েছে।
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জনবল সংকট দীর্ঘায়িত হলে পণ্য খালাসে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুল্কায়ন ও ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব হলে অফডকে কনটেইনার অবস্থানের সময় বাড়বে, যার ফলে আমদানিকারকদের ডেমারেজ ও অতিরিক্ত কনটেইনার ভাড়াসহ বাড়তি পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে। আবার রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়নে দেরি হলে সময়মতো জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) ব্যাহত হতে পারে।
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিক্রিয়া ও এনবিআরের পদক্ষেপ
চট্টগ্রাম কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘কাস্টমস হাউস আইসিডি সরকারের একটি নতুন ও প্রশংসনীয় ধারণা। মূলত শুল্কায়ন কার্যক্রমে গতি আনা এবং ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যেই এটি চালু করা হয়। তবে, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এটি এখন উল্টো ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় বেশি লাগায় ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি এভাবে চলতে থাকলে সরকারও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। আমরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তবে জরুরি ভিত্তিতে এখানে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’
আমদানি-রপ্তানি শুল্কায়নে ধীরগতির কারণে পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগছে, যা ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ ও কনটেইনার ভাড়াসহ পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এনবিআর প্রেষণ ও নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও দ্রুত অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পদায়ন না করা হলে সরকারি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা
এদিকে, জনবল সংকট নিরসনে দাপ্তরিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস হাউস আইসিডির কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন ও বদলিসংক্রান্ত একাধিক আদেশ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
তবে, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন জনবল কর্মস্থলে যোগ দিতে সময় লাগবে। অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে বিদ্যমান সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল কাজের চাপ সামলানো অসম্ভব। ফলে প্রেষণ বা জরুরি বদলির মাধ্যমে দ্রুত অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পদায়ন না করা হলে ফাইলজট ও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে কাস্টমস হাউস আইসিডির সহকারী কমিশনার শওকত হোসেন ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, আমাদের মোট জনবলের মাত্র ২০ শতাংশ দিয়ে আপাতত কাজ চালাতে হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে আমরা এনবিআরকে চিঠি দিয়েছি। চিঠির জবাবে ইতোমধ্যে নতুন কর্মকর্তা সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।