
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। জীবনের নানা ঘটনাকে একসময় তিনি অলৌকিক ঘটনা বলে অভিহিত করেছিন।
বামপন্থী রাজনীতির এই প্রভাবশালী নেতা ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
রিও ডি জেনেইরো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের পর এ জয় পেলেন লুলা। তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল ধাতুশ্রমিকদের একটি ট্রেড ইউনিয়নের অন্দরমহল থেকে। এমনকি তাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল।
চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে জয়ের পথটি তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না।
প্রায় ৮১ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় লুলা নির্বাচনী প্রচারের সময় স্কোয়াট ব্যায়াম করেছেন এবং দৌড়িয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তিনি এখন বেশি কর্মক্ষম।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় স্থান পাওয়ায় প্রথমে কিছুটা হতবাক হয়ে পড়েন লুলা। তবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনী প্রচারে জোরেশোরে মাঠে নামেন।
প্রচারের শেষ মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়ান তিনি। নিজের ভিডিও ধারণ করে পোস্ট করেন। এমনকি প্রথমবারের মতো একটি মোবাইল ফোনও কেনেন।
এই পরিবর্তন ব্রাজিলের মানুষের সঙ্গে তার কিছুটা দূরত্বের বিষয়টি সামনে আনে। দেশটির জনগণের বড় একটি অংশ অনলাইনভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ও রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে বিভক্ত। প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ১৪ বছর পরও এই বাস্তবতার সঙ্গে তার খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লুলার এ জয় ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে বামপন্থী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরে রেখেছে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যখন ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝোঁক বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছেন।
দারিদ্র্য, প্রেসিডেন্টের পদ, কারাবাস
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা লুলার উত্থান দারিদ্র্য থেকে প্রেসিডেন্টের পদে। পরে তিনি কারাবরণ করেন। প্রায় চার বছর আগে আবার ক্ষমতায় ফিরে রাজনৈতিক ভস্মস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ান তিনি।
প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারে নিজের জীবনকাহিনী ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন লুলা।
তবে সমালোচকদের মতে, ক্লান্ত ও হতাশ ব্রাজিলীয়রা কী শুনতে চান, তা বুঝতে ভুল করেছিলেন তিনি।
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শুষ্ক রাজ্য পেরনামবুকোতে চরম দারিদ্রের মধ্যে বেড়ে ওঠেন লুলা। নিরক্ষর কৃষক পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম।
শৈশবে জুতা পালিশ ও চিনাবাদাম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি। পরে ধাতুশ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হন। ষাটের দশকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তার একটি আঙুল কাটা পড়ে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরপর তিনবার পরাজিত হওয়ার পর অবশেষে ২০০৩ সালে রাজধানী ব্রাসিলিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করেন লুলা।
২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি।
২০১০ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সময় শ্রমজীবী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক নায়ক। তার শাসনামলে পণ্যনির্ভর অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
তবে ব্যাপক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি লুলা ও তার দলকে তাড়া করে ফেরে। এতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়, যা ২০১৮ সালে জইর বলসোনারোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
নির্বাচনের আগে লুলাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে প্রক্রিয়াগত কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিল করা হয়। এ মামলার প্রধান বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে এসবের মধ্য দিয়ে লুলা অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাননি। দুর্নীতির ওই কেলেঙ্কারি ব্রাজিলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক মেরুকরণেও ভূমিকা রাখে।
বলসোনারোর প্রেসিডেন্টের মেয়াদে বিভক্তি আরও গভীর হয়। ২০২২ সালের নির্বাচনে অতি সামান্য ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় ফিরে আসেন লুলা।
‘দরিদ্রদের প্রতি ভালোবাসা’
লুলার তৃতীয় মেয়াদে তার কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে, পূর্বসূরির আমলে ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক কর্মসূচিগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, আমাজন বন ধ্বংসের গতি কমানো ও ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
তবে পাঁচ সন্তানের জনক লুলাকে এখনো অনেক ভোটারের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে হতাশ ভোটারদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নন।
ব্রাজিলের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
উচ্চ সুদের হারের কারণে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই সরকারকে মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও সমালোচিত হয়েছেন লুলা। এর মধ্যে রয়েছে ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বৃদ্ধি। ২০ বছর আগে চালু হওয়া এ কর্মসূচিকে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রোববারের এই অপ্রত্যাশিত জয় তার সমর্থকদের বিস্মিত ও উচ্ছ্বসিত করেছে। তাদের অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, ফ্লাভিও বলসোনারো প্রেসিডেন্ট হলে তাত্ত্বিকভাবে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24