চাঁদকে ঘিরে একটি ঐতিহাসিক পরিক্রমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস মিশনের নভোচারীরা। নাসার এই মিশনে প্রথমবারের মত কোনো নারী এবং প্রথমবারের মত কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি চাঁদের চারপাশে উড়বেন। রোববার এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের কাছাকাছি পৌঁছান তারা।
হিউস্টন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তিন মার্কিন ও এক কানাডিয়ান নভোচারীর এই দলটি শিগগিরই সেই মাহেন্দ্রক্ষণে পৌঁছাবে, যখন চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ মহাকাশযানটির গতিপথ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে এবং অরিয়ন ক্যাপসুলটিকে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মত চাঁদের কক্ষপথে ঘুরিয়ে আনবে।
এই মিশনে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে ভ্রমণ করবেন, যা আগে কোনো মানুষ যাননি।
এই ঐতিহাসিক যাত্রা জুড়ে আছে একঝাঁক নতুন রেকর্ড। ভিক্টর গ্লোভার হবেন চাঁদের চারপাশে উড়ে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ আর ক্রিস্টিনা কক হবেন প্রথম নারী।
অন্যদিকে কানাডিয়ান জেরেমি হ্যানসেন মার্কিন নাগরিক নন।
এই তিন জনের সঙ্গে মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান সোমবারের চন্দ্র পরিক্রমার বেশিরভাগ সময় চাঁদের নানা বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করার কাজে ব্যয় করবেন।
‘চাঁদের দূরের পিঠ’
নভোচারীরা ইতোমধ্যে চাঁদের এমন কিছু দৃশ্য দেখতে শুরু করেছেন, যা এর আগে কোনো মানুষের খালি চোখে দেখার সুযোগ হয়নি।
রোববার ভোররাতে নাসা আর্টেমিস দলের তোলা একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে দূরের চাঁদে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওরিয়েন্টালে বেসিন।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থাটি জানায়, ‘এই মিশনে প্রথমবারের মত মানুষের চোখে ধরা পড়ল পুরো বেসিনটি।’
বিশাল এই গহ্বরটি দেখতে অনেকটা বুলসআই আকৃতির। এর আগে কেবল কক্ষপথ থেকে তোলা ক্যামেরার মাধ্যমে এটি দেখা গেছে ।
মহাকাশ থেকে সরাসরি কানাডিয়ান শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় কক জানান, এই বেসিনটি দেখার জন্যই দলটি সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিল। এটিকে যাকে কখনো কখনো চাঁদের ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ বলা হয়।
কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির আয়োজনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কক বলেন, ‘এটা এতটাই অনন্য যে আজকের আগে কোনো মানুষ নিজের চোখে এই গহ্বর দেখেনি। আমরা সত্যিই সৌভাগ্যবান।’
চন্দ্র পরিক্রমার শেষ দিকে নভোচারীরা একটি বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হবেন, সেটি হল সূর্যগ্রহণ। সেই মুহূর্তে চাঁদের আড়ালে ঢাকা পড়বে সূর্য। কেবল সূর্যের সবচেয়ে বাইরের বায়ুমণ্ডল, অর্থাৎ সোলার করোনা দেখা যাবে।
চার নভোচারী কিছুটা সময় ব্যয় করবেন তাদের ‘অরিয়ন ক্রু সার্ভাইভাল সিস্টেম’ মহাকাশ পোশাক পরীক্ষা করে দেখতে।
কমলা রঙের এই পোশাকগুলো উৎক্ষেপণ ও পুনরায় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় নভোচারীদের সুরক্ষা দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতেও ব্যবহারযোগ্য এই পোশাক ছয় দিন পর্যন্ত শ্বাস নেওয়ার মত বায়ু সরবরাহ করতে পারে।
মহাকাশে এই ওসিএসএস পোশাক পরার এটাই প্রথম সুযোগ নভোচারীদের। কত দ্রুত পোশাকটি গায়ে পরা যায় এবং চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এ সব কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখবেন তারা।
চার নভোচারী চাঁদের মাটিতে নামবেন না। তবে চাঁদকে ঘিরে পরিক্রমার সময় পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বের রেকর্ড ভাঙবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী একদিনে ‘তারা চাঁদের দূরের পিঠে চলে যাবেন, সেই রেকর্ড ভেঙে দেবেন এবং মহাকাশযান সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানতে পারব’ বলে রোববার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন জানান প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান।
তিনি আরও বলেন, এই তথ্য-উপাত্ত ২০২৭ সালের আর্টেমিস-৩ এবং ২০২৮ সালের আর্টেমিস-৪-এ চাঁদে অবতরণের প্রস্তুতির জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ হবে।
নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস দলটি ইতোমধ্যে ম্যানুয়াল পাইলটিং পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং চন্দ্রপরিক্রমার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেছে। চাঁদ প্রদক্ষিণের সময় কোন কোন পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও ছবি তুলতে হবে, তাও ঝালিয়ে নিয়েছেন তারা।
রোববার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাসাপ্রধান আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘আমরা মূলত মহাকাশযানের জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এই মহাকাশযানে এটাই নভোচারীদের প্রথম উড়ান। এখান থেকে তথ্য সংগ্রহই এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় আগ্রহ।’