এস চাঙমা সত্যজিৎ
ভ্রাম্যমান প্রতিনিধিঃ
ভয়াবহ লোগাঙ গণহত্যার ৩৪তম বার্ষিকীতে খাগড়াছড়িতে স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), খাগড়াছড়ি জেলা শাখা।
আজ শুক্রবার ১০ এপ্রিল ২০২৬ সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
স্মরণ সভার শুরুতে ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল সংঘটিত লোগাঙ গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
“শহীদের রক্তস্নানে জ্বলে ওঠো, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হও ছাত্র-যুব-জনতা”—এই শ্লোগানে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় পিসিপি’র খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সভাপতি তৃষ্ণাঙ্কর চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক প্রাঞ্জল চাকমা সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক অনিমেষ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য এন্টি চাকমা, ইউপিডিএফ সংগঠক লালন চাকমা এবং ৯২ সালের লোগাঙ গণহত্যার ভুক্তভোগী পরিবারবর্গ থেকে অমিয় কান্তি চাকমা ও শুভ চাকমা।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, অমিয় কান্তি চাকমা বলেন, সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম। হঠাৎ শোনা যায় সেনাবাহিনী ও সেটলাররা মানুষ মারা শুরু করেছে। অনেকে বলেছে কিছু হবে না। কিন্তু রাত ১ টার দিকে সেনাবাহিনী ও সেটলাররা আবার হামলা করে এবং ঘরবাড়িতে আগুন দেয়। এ সময় আমাদের গ্রামের মানুষদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে অনেকজন নিহত হয় ও অনেকে প্রাণ ভয়ে কোনমতে পালিয়ে যায়।
ভূক্তভোগী পরিবারের আরেকজন শুভ চাকমা বলেন, আমরা ছিলাম ৩ ভাই বোন। লোগাঙ গণহত্যার সময় আমার বয়স ছিল ৬ বছর। আমার মাকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয় তখন আমার বোনের বয়স ছিল ২ বছর। অনেক কষ্টে আমরা গণহত্যা থেকে রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো পাইনি। আমরা লোগাঙ গণহত্যার বিচার চাই।
ইউপিডিএফ সংগঠক লালন চাকমা বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও বহিরাগত সেটলার বাঙালি কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো গণহত্যার সুবিচার পাহাড়ি জনগণ পায়নি। সরকার পালাবদল হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এ বিচার অবশ্যই একদিন না একদিন রাষ্ট্রকে করতে হবে এবং পাহাড়ি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই বিচার আদায় করতে হবে।
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ি জনগণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেছিল। কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করা হয়।
তিনি বলেন, পাহাড়ি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএস শান্তিবাহিনী গঠন করে সরকারের সাথে দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াইয়ের পর ১৯৯৭ সালে জেএসএস ও সরকারের মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও পাহাড়ি জনগণের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। তাই পাহাড়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প নেই।
পিসিপির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক অনিমেষ চাকমা বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গণহত্যা, দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে কোনো জাতিকে চিরতরে দমিয়ে রাখা যায় না। শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। পাহাড়ি জনগণের ওপর দমন-পীড়নের নীতি পরিহার করে সরকারকে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নারী নেত্রী এন্টি চাকমা বলেন, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা, বাস্তুভিটা ও নারীদের সম্মান রক্ষার্থে নারী-পুরুষ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে তৃষ্ণাঙ্কর চাকমা বলেন, ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল লোগাঙের বর্বর গণহত্যার বর্ণনা তিনি তার মায়ের কাছ থেকে শুনেছেন, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু আজও নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নয়।
তিনি আরো বলেন, তৎকালীন খালেদা জিয়ার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সেটলার বাঙালিরা খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির লোগাঙে পাহাড়িদের ওপর বর্বর গণহত্যা চালায়। সেনা-বিডিআর ও সেটলারদের যৌথ হামলায় সেদিন কয়েকশ’ (প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ১,২০০-এর অধিক) পাহাড়ি হতাহত হয়। অনেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। সেদিন শিশু, বৃদ্ধ, নারী—কেউই রেহাই পায়নি। অগ্নিসংযোগ করে পাহাড়িদের ৭০০-এর অধিক ঘরবাড়ি ছাই করে দেওয়া হয়।
তিনি ছাত্র-যুব সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে দূরে থেকে আন্দোলনমুখী হওয়ার আহ্বান জানান এবং লোগাঙ গণহত্যাসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও বহিরাগত সেটলার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে এ যাবত সংঘটিত সকল গণহত্যার শ্বেতপত্র প্রকাশ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান।
স্মরণসভা শেষে গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়। এতে খাগড়াছড়ি সদর এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী, যুবক ও স্থানীয় কার্বারিরা অংশগ্রহণ করেন।