আলমগীর মানিক, রাঙামাটিঃ
সবুজ পাহাড়, বিশাল কাপ্তাই হ্রদ আর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত রাঙামাটি। কিন্তু পর্যটনের এই জনপদের আরেকটি বাস্তবতা হলো; দুর্গম পাহাড়, বিচ্ছিন্ন বসতি ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখানকার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়ক কিংবা নৌপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৌঁছাতে হয় হাজারো মানুষকে। তাদের অনেকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
এমন বাস্তবতায় সীমাহীন জনবল সংকট ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি সত্ত্বেও প্রতিদিন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় জেলার লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলায় চিকিৎসকের অনুমোদিত মোট পদ ৩১১টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৫৮ জন এবং শূন্য রয়েছে ১৫৩টি পদ। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেকই দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। ফলে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়েই দুর্গম ১০টি উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করতে হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে চিকিৎসকের অনুমোদিত পাঁচটি পদের মধ্যে একটি শূন্য রয়েছে। রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে অনুমোদিত ৬১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৩ জন চিকিৎসক; শূন্য রয়েছে ৩৮টি পদ। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ৯টি পদই পূরণ রয়েছে।
দুর্গম উপজেলা লংগদু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন চিকিৎসক; শূন্য ১৯টি। বাঘাইছড়িতে ২৯টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৩ জন, শূন্য ১৬টি। বিলাইছড়িতে ২৮টির মধ্যে কর্মরত ১৪ জন, শূন্য ১৪টি। রাজস্থলীতে ২৮টির মধ্যে কর্মরত ১৭ জন, শূন্য ১১টি। নানিয়ারচরে ২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ১১ জন, শূন্য ১৪টি।
জুরাছড়িতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক; ২৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭ জন চিকিৎসক, ফলে ১৮টি পদ খালি রয়েছে। বরকলে ২৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ১০ জন, শূন্য ১৬টি। কাপ্তাইয়ে ১৭টির মধ্যে ১৫টি এবং কাউখালীতে ২৬টির মধ্যে ২২টি পদ পূরণ রয়েছে। বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালের অনুমোদিত দুটি করে চিকিৎসকের পদই বর্তমানে পূরণ রয়েছে।
শুধু চিকিৎসক নয়, বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দুর্গম উপজেলাগুলোতে জনবল ধরে রাখা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে। বর্তমান সরকারের সময়ে হাসপাতালটিতে নিয়মিত জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো চক্ষু অপারেশন চালু হয়েছে। অর্থোপেডিক বিভাগে কোমরের হাড় প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচারও শুরু হয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে ৯৮টি মেজর জেনারেল সার্জারি, ৪৮টি মেজর অর্থোপেডিক সার্জারি, ৪১টি সিজারিয়ান সেকশন এবং ৮টি বড় গাইনিকোলজিক্যাল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। সীমিত জনবল নিয়েও এমন সাফল্য জেলার স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মূল্যায়নেও রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে সারা দেশের সরকারি হাসপাতালের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে হাসপাতালটি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের সূচকে ২৩তম স্থান অর্জন করে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) জানান, “রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল মূলত ৫০ শয্যার হাসপাতাল ছিল। বর্তমানে এটি প্রশাসনিকভাবে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখনও ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন ইনডোরে ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং আউটডোরে গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে গাইনি, সার্জারি, প্যাথোলজি, চক্ষু, রেডিওলজি, শিশু, চর্মরোগ এবং নাক-কান-গলা বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম, ডিজিটাল এক্স-রে, ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা, ট্রোপোনিন-আই, থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (টিএসএইচ, এফটি-৩ ও এফটি-৪)সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তে প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষাও চালু রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম) ও পিএসএ অক্সিজেন প্ল্যান্ট রয়েছে। আধুনিক ইনসিনারেটরের মাধ্যমে সংক্রমণজনিত মেডিকেল বর্জ্য নিরাপদভাবে অপসারণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সহযোগিতায় চক্ষু অপারেশন কার্যক্রম চালু হওয়ায় জেলার দরিদ্র ও প্রান্তিক রোগীরা স্বল্প খরচে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। এছাড়া গাইনি বিভাগে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সিজারিয়ান সেকশন, হিস্টেরেকটমি, সিস্ট অপারেশন এবং এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। সার্জারি বিভাগেও নিয়মিত জেনারেল ও অর্থোপেডিক অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে হাসপাতালের নতুন ১১ তলা ভবনের মধ্যে ছয় তলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে আইসিইউ, সিসিইউ এবং কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব ইউনিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, বেড, আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ মনিটর, ডিফিব্রিলেটর, হাই-ফ্লো অক্সিজেন, সিপ্যাপ/বাইপ্যাপ মেশিন, সিরিঞ্জ পাম্প এবং আধুনিক আইসিইউ বেডসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন। এসব জনবল ও সরঞ্জাম বরাদ্দের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে আবেদন করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে জনবল সংকট অনেকটাই কমে আসতে পারে।
রাঙামাটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র একদিকে যেমন সংকটের, অন্যদিকে তেমনি সম্ভাবনারও। সীমিত জনবল ও অপ্রতুল সরঞ্জাম নিয়েও যেভাবে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, তা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতারই প্রতিফলন। এখন সময়োপযোগী জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগ পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে; এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।