ঢাকা ০৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ঢাকা পিৎজা হাউস অ্যান্ড রেস্তোরাঁ’র শুভ উদ্বোধন মিলছে ১৫% ছাড়! বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশনা জারি গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বাড়াতে দু’টি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব, স্থলবন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ কালিয়াকৈরে এক বৃদ্ধের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয় ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী ‘আনলকিং ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস ফর ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট’প্রকল্পের সমাপনী সভা বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস আরও সম্প্রসারণ করা হবে: সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ভিত্তিক ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ উদ্বোধন উলিপুরে ইয়া/বা, গা/জা ও মা/দক বিক্রয়ের নগদ টাকা সহ মা/দ/ক ব্যবসায়ী গ্রে/প্তার

গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা

বাংলাদেশের উজ্জল সম্ভাবনাময় পোশাক কারখানাসমূহের অন্যতম স্থান হলো গাজীপুর। দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে এক নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটে গেছে গাজীপুরে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই উৎপাদনের ওপর যখন সর্বাধিক জোর দেয়া হচ্ছে, তখন গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা। মার্কিন গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল স্বীকৃত শতভাগ পরিবেশবান্ধব কারখানা বা ‘লিড’ সার্টিফাইড কারখানার এক বিশাল অংশ এখন এ জেলাতেই অবস্থিত, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরেজমিনে গাজীপুরের শ্রীপুর, কোনাবাড়ী ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, অন্ধকারাচ্ছন্ন, অপরিসর ও উত্তপ্ত গতানুগতিক পরিবেশ পেছনে ফেলে আধুনিক এসব গ্রিন ফ্যাক্টরি আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ। কারখানার উন্মুক্ত এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ বাগান। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পানির অপচয় রোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মপরিবেশ।

টেকসই প্রযুক্তি: শক্তি ও পানির সাশ্রয়

গাজীপুরের পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদ ও শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার। কারখানাগুলোর ছাদে বসানো বিশাল আকৃতির সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল দিনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেটায়। এরফলে প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং কার্বন নির্গমন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার রোধে এসব কারখানায় চালু করা হয়েছে ‘রেইনওয়াটার হারভেস্টিং’ বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি। বিশাল ছাদ থেকে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পরিশোধনের মাধ্যমে ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো কাজে পুনঃব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ইটিপি এর মাধ্যমে বর্জ্য পানি শোধন ও রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।

বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় গাজীপুরের প্রাধান্য

পরিবেশবান্ধব স্থাপনার বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশে বর্তমানে লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা ২৯১টি, যার মধ্যে ১১১টি সর্বোচ্চ মানের ‘প্লাটিনাম’ এবং ১৩৩টি ‘ গোল্ড’ সনদপ্রাপ্ত।

সর্বশেষ মানদণ্ড অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিবিসি প্রদত্ত পয়েন্ট তালিকায় বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে বাংলাদেশেরই প্রাধান্য। ১১০ পয়েন্টের মধ্যে ১০৮ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের এক নম্বর বা শীর্ষ পরিবেশবান্ধব কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে গাজীপুরের হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড। ১০৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত মাসকো গ্রুপের ‘তাসনিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেড’। এছাড়া দেশের সেরা শীর্ষ পরিবেশবান্ধব কারখানার তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের এসএম সোর্সিং, তানিশা ফেব্রিকস, ইস্প্রিট অ্যাপারেলস, নিট এশিয়া, ইন্ট্রিগ্রা ড্রেসেস, লিডা টেক্সটাইল অ্যান্ড ডাইং এবং লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ।

উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের সুফল সম্পর্কে মাসকো গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (রক্ষণাবেক্ষণ) প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন খান বাসস’কে জানান, ‘নির্মল বাতাস, শক্তি সাশ্রয়ী লাইটিং, পানির অপচয় রোধ ও ৩০% সবুজ এলাকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা কাজের চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছি। বায়াররা এখনো সরাসরি কোনো বাড়তি ‘প্রাইস বেনিফিট’ না দিলেও অভ্যন্তরীণ পরিচালনা খরচ নিয়ন্ত্রণ, লস শনাক্তকরণ এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি অত্যন্ত কার্যকর। এ সুফলের কারণে আমাদের গ্রুপের ১৪টি কারখানাকেই পর্যায়ক্রমে এই মানদণ্ডে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বাসস’কে বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক লিড সনদপ্রাপ্ত সবুজ পোশাক কারখানার দেশ। তবে কেবল ভবনের সনদই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত অর্থে একটি গ্রিন কারখানাকে জ্বালানি দক্ষতা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, পানি সাশ্রয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক দক্ষতা দেখাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রধান বাজারগুলোতে পরিবেশ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে। আগামী দিনে টেকসই উৎপাদন কেবল কমপ্লায়েন্স নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে উঠবে। গাজীপুরকে একটি মডেল ‘গ্রিন গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার, বিজিএমইএ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে যৌথভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের সাড়া

হ্যামস গার্মেন্টসসহ শীর্ষ স্থানীয় গ্রিন প্রজেক্টগুলোর কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘৩৬০ ডিগ্রি টোটাল সলিউশন’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত আহমেদ বাসস’কে বলেন, গাজীপুরে বিপুলসংখ্যক গ্রিন বিল্ডিং গড়ে ওঠার মূল কারণ তৈরি পোশাক খাতের সাস্টেইনেবিলিটি চর্চা এবং বায়ারদের চাহিদা। গ্রিন বিল্ডিং তৈরি করলে এনার্জি ও ওয়াটার এফিসিয়েন্সি বাড়ে, যা সরাসরি কারখানার পরিচালনা খরচ কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের ইতিবাচক মনোভাব তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, ‘গ্রিন সার্টিফিকেশনের কারণে ক্রেতারা সরাসরি বাড়তি অর্থ না দিলেও অর্ডারের ক্ষেত্রে শতভাগ অগ্রাধিকার দেন। অতীতে রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনের যে নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ববাজারে তৈরি হয়েছিল, আজ বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন প্রজেক্টের অধিকাংশ বাংলাদেশে থাকায় সেই কালিমা দূর হয়ে দেশের সুদৃঢ় ব্র্যান্ডিং তৈরি হয়েছে। লিড সার্টিফাইড কারখানাগুলো বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও প্রায় শতভাগ সক্ষমতায় উৎপাদনে থাকছে। অনেক আন্তর্জাতিক বায়ার গ্রিন সনদপ্রাপ্ত কারখানার শতভাগ উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বুকিং করে নিচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের দরকষাকষির অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।’

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতি সহায়তার দাবি

পরিবেশ প্রকৌশলী ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ। এই সবুজ শিল্পায়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্সিং, স্বল্প সুদে ঋণ, বিশেষ ট্যাক্স রেয়াত এবং নীতিগত প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি  কারখানাগুলোকে এই ধারায় যুক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে অনুদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা এই পরিবেশবান্ধব মডেলটি কেবল একটি অঞ্চলের সাফল্য নয়; এটি গোটা দেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর পথপ্রদর্শক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশ তার শীর্ষ অবস্থান নিশ্চিতভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ঢাকা পিৎজা হাউস অ্যান্ড রেস্তোরাঁ’র শুভ উদ্বোধন মিলছে ১৫% ছাড়!

গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা

আপডেট টাইম : ০৬:২৯:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের উজ্জল সম্ভাবনাময় পোশাক কারখানাসমূহের অন্যতম স্থান হলো গাজীপুর। দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে এক নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটে গেছে গাজীপুরে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই উৎপাদনের ওপর যখন সর্বাধিক জোর দেয়া হচ্ছে, তখন গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে এনে দিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা। মার্কিন গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল স্বীকৃত শতভাগ পরিবেশবান্ধব কারখানা বা ‘লিড’ সার্টিফাইড কারখানার এক বিশাল অংশ এখন এ জেলাতেই অবস্থিত, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরেজমিনে গাজীপুরের শ্রীপুর, কোনাবাড়ী ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, অন্ধকারাচ্ছন্ন, অপরিসর ও উত্তপ্ত গতানুগতিক পরিবেশ পেছনে ফেলে আধুনিক এসব গ্রিন ফ্যাক্টরি আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ। কারখানার উন্মুক্ত এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ বাগান। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পানির অপচয় রোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মপরিবেশ।

টেকসই প্রযুক্তি: শক্তি ও পানির সাশ্রয়

গাজীপুরের পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদ ও শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার। কারখানাগুলোর ছাদে বসানো বিশাল আকৃতির সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল দিনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেটায়। এরফলে প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং কার্বন নির্গমন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার রোধে এসব কারখানায় চালু করা হয়েছে ‘রেইনওয়াটার হারভেস্টিং’ বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি। বিশাল ছাদ থেকে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পরিশোধনের মাধ্যমে ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো কাজে পুনঃব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ইটিপি এর মাধ্যমে বর্জ্য পানি শোধন ও রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।

বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় গাজীপুরের প্রাধান্য

পরিবেশবান্ধব স্থাপনার বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশে বর্তমানে লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা ২৯১টি, যার মধ্যে ১১১টি সর্বোচ্চ মানের ‘প্লাটিনাম’ এবং ১৩৩টি ‘ গোল্ড’ সনদপ্রাপ্ত।

সর্বশেষ মানদণ্ড অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিবিসি প্রদত্ত পয়েন্ট তালিকায় বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে বাংলাদেশেরই প্রাধান্য। ১১০ পয়েন্টের মধ্যে ১০৮ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের এক নম্বর বা শীর্ষ পরিবেশবান্ধব কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে গাজীপুরের হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড। ১০৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত মাসকো গ্রুপের ‘তাসনিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেড’। এছাড়া দেশের সেরা শীর্ষ পরিবেশবান্ধব কারখানার তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের এসএম সোর্সিং, তানিশা ফেব্রিকস, ইস্প্রিট অ্যাপারেলস, নিট এশিয়া, ইন্ট্রিগ্রা ড্রেসেস, লিডা টেক্সটাইল অ্যান্ড ডাইং এবং লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ।

উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের সুফল সম্পর্কে মাসকো গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (রক্ষণাবেক্ষণ) প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন খান বাসস’কে জানান, ‘নির্মল বাতাস, শক্তি সাশ্রয়ী লাইটিং, পানির অপচয় রোধ ও ৩০% সবুজ এলাকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা কাজের চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছি। বায়াররা এখনো সরাসরি কোনো বাড়তি ‘প্রাইস বেনিফিট’ না দিলেও অভ্যন্তরীণ পরিচালনা খরচ নিয়ন্ত্রণ, লস শনাক্তকরণ এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি অত্যন্ত কার্যকর। এ সুফলের কারণে আমাদের গ্রুপের ১৪টি কারখানাকেই পর্যায়ক্রমে এই মানদণ্ডে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বাসস’কে বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক লিড সনদপ্রাপ্ত সবুজ পোশাক কারখানার দেশ। তবে কেবল ভবনের সনদই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত অর্থে একটি গ্রিন কারখানাকে জ্বালানি দক্ষতা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, পানি সাশ্রয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক দক্ষতা দেখাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রধান বাজারগুলোতে পরিবেশ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে। আগামী দিনে টেকসই উৎপাদন কেবল কমপ্লায়েন্স নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে উঠবে। গাজীপুরকে একটি মডেল ‘গ্রিন গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার, বিজিএমইএ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে যৌথভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের সাড়া

হ্যামস গার্মেন্টসসহ শীর্ষ স্থানীয় গ্রিন প্রজেক্টগুলোর কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘৩৬০ ডিগ্রি টোটাল সলিউশন’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত আহমেদ বাসস’কে বলেন, গাজীপুরে বিপুলসংখ্যক গ্রিন বিল্ডিং গড়ে ওঠার মূল কারণ তৈরি পোশাক খাতের সাস্টেইনেবিলিটি চর্চা এবং বায়ারদের চাহিদা। গ্রিন বিল্ডিং তৈরি করলে এনার্জি ও ওয়াটার এফিসিয়েন্সি বাড়ে, যা সরাসরি কারখানার পরিচালনা খরচ কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের ইতিবাচক মনোভাব তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, ‘গ্রিন সার্টিফিকেশনের কারণে ক্রেতারা সরাসরি বাড়তি অর্থ না দিলেও অর্ডারের ক্ষেত্রে শতভাগ অগ্রাধিকার দেন। অতীতে রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনের যে নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ববাজারে তৈরি হয়েছিল, আজ বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন প্রজেক্টের অধিকাংশ বাংলাদেশে থাকায় সেই কালিমা দূর হয়ে দেশের সুদৃঢ় ব্র্যান্ডিং তৈরি হয়েছে। লিড সার্টিফাইড কারখানাগুলো বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও প্রায় শতভাগ সক্ষমতায় উৎপাদনে থাকছে। অনেক আন্তর্জাতিক বায়ার গ্রিন সনদপ্রাপ্ত কারখানার শতভাগ উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বুকিং করে নিচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের দরকষাকষির অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।’

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতি সহায়তার দাবি

পরিবেশ প্রকৌশলী ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ। এই সবুজ শিল্পায়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্সিং, স্বল্প সুদে ঋণ, বিশেষ ট্যাক্স রেয়াত এবং নীতিগত প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি  কারখানাগুলোকে এই ধারায় যুক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে অনুদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা এই পরিবেশবান্ধব মডেলটি কেবল একটি অঞ্চলের সাফল্য নয়; এটি গোটা দেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর পথপ্রদর্শক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশ তার শীর্ষ অবস্থান নিশ্চিতভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।


প্রিন্ট