পবিত্র ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিনেও রংপুর বিভাগজুড়ে বইছে উৎসবের রঙিন জোয়ার। টানা ছুটির আবহে মানুষের আনন্দ যেন থামতেই চাইছে না। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে নগর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন একটাই সুর, আনন্দ আর অবকাশের।
সোমবার সকাল গড়াতেই দলে দলে মানুষ ছুটে যান বিভিন্ন বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রে। গত দুই দিনের মতো তৃতীয় দিনেও এসব স্থানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে রংপুরের পার্ক, উদ্যান, নদীতীর আর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা রঙিন পোশাকে নিজেদের মতো করে উদ্যাপন করছে ঈদের আনন্দ, যা পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত।
নগরীর ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত ‘প্রয়াস’ বিনোদন পার্ক, ফ্যান্টাসি জোন, তাজহাট জমিদার বাড়ি, চিকলী লেক ওয়াটার পার্ক, রংপুর চিড়িয়াখানার শিশু পার্ক, ‘সুরভী উদ্যান’ ও ‘রূপকথা থিম পার্ক’—সবখানেই ছিল মানুষের ঢল। টাউন হল চত্বর, জেলা স্কুল মাঠ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়।
শুধু নগরেই নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও ছিল একই চিত্র। পীরগঞ্জের গঞ্জিপুর ভিন্নজগত, আনন্দনগর পার্ক; বদরগঞ্জের মায়া ভুবন; কাউনিয়ার তিস্তা পার্ক ও তিস্তা সেতু; পীরগাছার নীলাম্বর জলমহল, আলী বাবা থিম পার্ক ও তাজ ইকোভেঞ্চার; গঙ্গাচড়ার মহিপুর ঘাট এবং তিস্তা ব্যারেজ খাল—সবখানেই দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলাগুলোও পিছিয়ে নেই। দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী কৃত্রিম বিনোদন পার্ক, কান্তজিউ মন্দির, রামসাগর ও রাজবাড়ি; নীলফামারীর নীলসাগর ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প; পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো, মহানন্দা নদীর তীর, কাজী ও কাজী টি এস্টেট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর; কুড়িগ্রামের ধরলা সেতু, তিন-বিঘা করিডোর, বুড়িমারী জিরো পয়েন্ট এবং লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া উপস্থিতি।
ঈদের এই ভিড়কে ঘিরে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন স্থানে বসেছে অস্থায়ী মেলা, হস্তশিল্পের দোকান, খাবারের স্টল ও খেলনার পসরা। ফলে বিনোদনের পাশাপাশি জমে উঠেছে ছোটখাটো বাণিজ্যও।
প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে চিকলী লেক ওয়াটার পার্ক। সেখানে নৌভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে সময় কাটিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন অনেকেই। শিক্ষার্থীরা জানান, ঈদের ছুটিতে এমন পরিবেশে ঘুরে বেড়ানো তাদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
গঙ্গাচড়ার মহিপুর ঘাটে তিস্তা সেতুতে ঘুরতে আসা এক দম্পতি বলেন, পরিবারের সঙ্গে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর এই সুযোগ তাদের ঈদ আনন্দকে আরও পরিপূর্ণ করেছে। একইভাবে কাউনিয়ার তিস্তা ব্রিজ ও পার্কে ঘুরতে আসা তরুণ-তরুণীরা নদীর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে মুগ্ধতার কথা জানান।
রংপুর চিড়িয়াখানার শিশু পার্কে শিশুদের কোলাহলে মুখর পরিবেশে পরিবারগুলো উপভোগ করছে নাগরদোলা ও পশুপাখি দেখা। ‘প্রয়াস’ পার্কেও দর্শনার্থীরা বিনোদন সুবিধা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
রংপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, এই অঞ্চলে ঈদ, বাংলা নববর্ষসহ নানা উৎসবে মানুষের বিনোদনকেন্দ্রিক সমাগম দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তিনি মনে করেন, মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিনোদনের চাহিদা আরও বাড়বে এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে, ঈদের তৃতীয় দিনেও রংপুর বিভাগ যেন রূপ নিয়েছে এক বিশাল উন্মুক্ত আনন্দমেলায়—যেখানে প্রকৃতি, মানুষ আর উৎসব মিলেমিশে তৈরি করেছে অনন্য এক উদযাপনের ছবি।