উত্তরের জেলা গাইবান্ধা। এই জেলা কৃষির উপর নির্ভরশীল। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর উজানের ঢলে জেলার অনেক এলাকায় আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে অনেক বীজতলা পচে নষ্ট হয়েছে। বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেক কৃষক। এতে করে তাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গাইবান্ধা সাতটি উপজেলা, ৮১ টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। সবকটি উপজেলা নদীবেষ্টিত। এর মধ্য গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটায় ছোট বড় মিলে প্রায় ১৭৫ টি চর রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ফসলের জমি পানির নীচে তলিয়ে যায়।
চলতি মৌসুমে জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমি। এসব জমিতে ধান রোপণের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। এরমধ্যে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর বীজতলা। বীজতলাসহ জেলায় প্রায় ৩১০ হেক্টর জমির শাক সবজি পানির নিচে।
সম্প্রতি সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব বীজতলার চিত্র দেখা গেছে। জানা যায়, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করা হয়। এসব আমনের চারা শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা হয়। চাষিরা এবার সময়মতো বীজতলা তৈরি করেছিলেন।
গত এক সপ্তাহ টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। ফলে উপকূলীয় এই নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যে সব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, সেসব এলাকায় বৃষ্টি থামার এক দুই দিনের মধ্যে জমি থেকে পানি নেমে গেছে। তবে বীজতলার চারার অবস্থা ভালো নেই। জলাবদ্ধতার কারণে জেলার অনেক এলাকার বীজতলা পুরোপরি পানির নিচে পড়ে আছে।
জেলার গোবিন্দগঞ্জে নাকাই ইউনিয়নের শীতল গ্রামের কৃষক সাজু মিয়া বাসসকে বলেন, এ বছর দশ বিঘা আমান ধান লাগানোর জন্য আমন ধানের বীজতলা দিয়েছিলাম। ধান গাছের চারাগুলোর বয়স ১০ থেকে ১২ দিন। হঠাৎ এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে পানির নিচে তলে যায়। চারাগুলো পানির নীচে থেকে নষ্ট হয়ে যায়।
উপজেলার ধান খনিয়া গ্রামের আজিজার রহমান বলেন, এক টানা বৃষ্টির কারণেই আমার আমন ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বীজ তলা তৈরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া বলেন, এ বছর প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের পরিকল্পনা ছিল। সেজন্য প্রায় ২৫ শতাংশ জমির বীজতলা তৈরি করেছিলাম। প্রায় ২০-২২ দিনের চারা। জমিতে সার প্রয়োগ করার পরের দিন থেকে বৃষ্টি। এক সপ্তাহ ধরে চারাগুলো পানির নিচে। চারার মাথায় পচন ধরেছে। এই চারা রোপণ করা যাবে না।
একই গ্রামের বকুল মিয়া প্রায় ৫ বিঘা জমিতে আমন ধান লাগানোর জন্য ১২ শতাংশ জমিতে বীজতলা করেন। সব চারা পচে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে বা ক্রয় করে ধান রোপণের চিন্তা করছেন। এতে খরচ বাড়বে।
উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান ১৫ দিন আগে বীজতলা তৈরি করছিলেন। চারাগুলো কিছুটা বড়ও হয়েছিল। কিন্তু এখন বীজতলায় থই থই পানি।
তিনি বলেন, ‘শুধু আমরার নয়, প্রায় কৃষকের বীজতলা পানির নিচে।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুরের কৃষক আযম আলী বাসসকে বলেন, ঘন ঘন বৃষ্টিতে বীজতলা ডুবে গেছে। সবগুলো চারা নষ্টের উপক্রম। নতুন করে বীজতলা তৈরির জন্য বেশি দামে বীজ ধান কিনেছি। এতে আমন চাষে প্রায় ২০ দিন পিছিয়ে যাবে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাগুড়া গ্রামের কৃষক এনামুল বলেন, এবছর আমন ধানের চারা রোপণ করার পর থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণই এই এলাকার অধিকাংশ ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার অনেক আমন ধানের বীজতলা এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। আমনের চারা আক্রান্ত হয়েছে। তবে বীজতলা থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর পরিচর্যা করলে ক্ষতি কমবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24