এম.এ আরিফ চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার: গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক প্রতিদিন নিজের নিরাপত্তা, সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যকে পিছনে ফেলে মানুষের অধিকার, সত্য এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানীর ব্যস্ত নগরী—যেখানেই কোনো ঘটনা ঘটে, সেখানে সত্য তুলে ধরার জন্য ছুটে যান সাংবাদিকরা।
আজ একটি প্রশ্ন সমাজের সামনে বারবার উঠে আসছে—সাংবাদিকের অন্যায়টা কোথায়?
অপরাধ, দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানুষের দুর্ভোগের সংবাদ প্রকাশ করাই কি সাংবাদিকের অপরাধ? নাকি সত্য প্রকাশ করাই তাদের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে? একজন সাংবাদিক যখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেন, তখন অনেক অজানা তথ্য জনসম্মুখে আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে, তদন্ত শুরু হয়, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনের আওতায় আসে। সত্য প্রকাশের এই সাহসী ভূমিকা সমাজকে আরও জবাবদিহিমূলক করে তোলে।
সাংবাদিক শুধু অপরাধের খবরই প্রকাশ করেন না; তারা সমাজের ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন। কোনো শিক্ষার্থীর অসাধারণ সাফল্য, মানবিক উদ্যোগ, অসহায় মানুষের সংগ্রাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প কিংবা দেশের উন্নয়নের নানা চিত্রও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সমাজে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয় এবং ভালো কাজ করার আগ্রহ বাড়ে।
কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে, দুর্ঘটনা ঘটলে, অন্যায়ের শিকার হলে কিংবা কোনো অসহায় মানুষ বিচার না পেলে—অনেক সময় সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। সংবাদমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করে এবং অনেক নির্যাতিত মানুষের ন্যায়বিচারের পথ খুলে দেয়।
দুর্যোগ, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, মহামারি কিংবা যেকোনো সংকটময় সময়েও সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থাকেন। তারা শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেন না; মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি জাতির সামনে তুলে ধরে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অনেক সময় তাদের প্রকাশিত সংবাদই প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সহায়তা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করে।
একজন সাংবাদিকও একজন মানুষ। তারও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, দায়িত্ব আছে। অথচ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক হুমকি, হামলা, মামলা, হয়রানি ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হন। মতের অমিল থাকতে পারে, সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে আইনি বা নীতিগত উপায়ে প্রতিকার চাওয়া যায়। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সাংবাদিকের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা নির্যাতন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে শুধু সাংবাদিকের অধিকার নয়; এটি জনগণের জানার অধিকারও। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক হতে সহায়তা করে।
আমাদের সবারই উচিত সত্যনিষ্ঠ, পেশাদার ও নৈতিক সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং পেশাগত নীতিমালা মেনে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে। কারণ বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতাই সমাজের আস্থা অর্জনের মূল ভিত্তি।
বিবেক মানুষের সবচেয়ে বড় আদালত। তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে সত্য প্রকাশকে ভয় নয়, সম্মান করা হবে; যেখানে দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন; এবং যেখানে সংবাদমাধ্যম মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থ রক্ষায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। কারণ সত্যের আলো নিভে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিক নন—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24