গায়ে কোনো জামা নেই। ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছেন। ঘামে ভিজে যাচ্ছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি দৌড়াচ্ছেন। থামছেন না। ৮০ বছর বয়সেও তিনি দেখাতে চান, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো জয়ী হওয়ার শক্তি ও সামর্থ্য এখনো তাঁর রয়েছে।
রিও দি জেনেইরো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
চার দশক ধরে ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী এই নেতা নিজের ব্যায়ামের ভিডিও নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
একটি ভিডিওতে কর্কশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর ঘূর্ণন বা সময়ের প্রবাহ কেউ থামাতে পারে না।’
বামপন্থি এই নেতা নির্বাচনে পরাজয় দেখেছেন। ৫৮০ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে রাজনৈতিক অপমানও সহ্য করেছেন। যদিও পরে সেই দণ্ড বাতিল হয়ে যায়, তবু ডানপন্থিদের কাছ থেকে এখনো তাঁকে কটূক্তি শুনতে হয়।
স্বাস্থ্যগত সংকটও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাথরুমে পড়ে গিয়ে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়।
এর পর থেকে তাঁকে প্রায়ই পানামা টুপি পরতে দেখা যায়। এক সময়ের ঘন কালো চুল এখন পেকে গেছে, পাতলাও হয়ে এসেছে। তাঁর পরিচিত দাড়িতেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
তবে লুলার দাবি, তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ফিট। তাঁর স্বপ্ন, ‘১২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা।’
-দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া-
লুলার জন্ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শুষ্ক প্রদেশ পারনামবুকোতে। নিরক্ষর কৃষক পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম।
শৈশবে তিনি জুতা পালিশ ও বাদাম বিক্রির কাজ করেছেন। পরে ধাতব কারখানার শ্রমিক এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হন। ১৯৬০-এর দশকে কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় তাঁর একটি আঙুল কেটে যায়।
টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ২০০৩ সালে তিনি প্রথমবার ব্রাসিলিয়ার প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন।
২০১০ সালে দায়িত্ব ছাড়েন একজন শ্রমজীবী মানুষের নায়ক হিসেবে। পণ্য রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তাঁর নেতৃত্বে প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে।
কিন্তু বড় বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারি লুলা ও তাঁর দলকে তাড়া করে বেড়ায়। জনঅসন্তোষের সেই ঢেউয়ের ওপর ভর করেই ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন কট্টর ডানপন্থি নেতা জাইর বোলসোনারো।
একই বছর লুলাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে বিচারপ্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মামলার অভিযোগ বাতিল করা হয়। মামলার প্রধান বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন বলেও প্রমাণিত হয়।
তবে লুলাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়নি। সেই কেলেঙ্কারি ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজনকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
বোলসোনারোর শাসনামলও ছিল সমানভাবে বিভক্তিকর। ২০২২ সালের নির্বাচনে খুব অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়ে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় ফেরেন লুলা।
পরে ক্ষমতায় ফিরে আসা ঠেকাতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার দায়ে বোলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়।
‘ব্রাজিলের বাইডেন’-
ক্ষমতায় ফিরে শুরুতে মনে হয়েছিল, তিনি যেন নতুন করে ব্রাজিলকে চিনছেন।
২১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই অতি-সংযুক্ত দেশে তিনি মোবাইল ফোন ছাড়াই জীবনযাপন করেন। দেশটি ভুয়া তথ্যের বন্যায়ও আক্রান্ত।
তাঁর কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে পূর্বসূরির বাতিল করা সামাজিক কর্মসূচি পুনরায় চালু করা, আমাজন রেইনফরেস্ট ধ্বংস কমিয়ে আনা এবং ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে আরও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
তবে তাঁর তৃতীয় মেয়াদকে অনেকেই আগের সময়ের ম্লান পুনরাবৃত্তি বলে মনে করেন। নতুন কোনো বড় ধারণা খুব একটা দেখা যায়নি। পাঁচ সন্তানের জনক লুলাকে এখনো মূল্যস্ফীতি, অপরাধ ও দুর্নীতিতে বিরক্ত ভোটারদের বড় একটি অংশ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
২০২২ সালে লুলা বলেন, তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন না।
তাহলে কেন তিনি এবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর এবং তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জাইর বোলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে ফ্লাভিও বোলসোনারোর মুখোমুখি হচ্ছেন?
লুলা, যিনি সম্ভাব্য কোনো উত্তরসূরি গড়ে তোলেননি, বলেন, কট্টর ডানপন্থীদের আবার ক্ষমতায় ফিরে এসে দেশকে ‘ধ্বংস’ করতে দেওয়া যাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদেশি কূটনীতিক এএফপিকে বলেন, ‘তিনি দারুণ ফিট।’ লুলাকে তিনি ‘নির্বাচনী প্রচারের দুর্দান্ত যোদ্ধা’ বলে বর্ণনা করেন।
তবে ফ্লাভিও বোলসোনারোর মন্তব্য ভিন্ন।
লুলার কাছে জো বাইডেন এক ধরণের সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তখনকার আশির কোঠার মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য শারীরিক ও মানসিক অবনতির বিষয়টি ব্রাজিলের এই নেতার ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছিল।
তাঁর বিরামহীন সফরসূচি ও তাৎক্ষণিক রসবোধ এখনো তাঁর কর্মক্ষমতার প্রমাণ দেয়। পাশাপাশি তিনি বলেন, তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ৫৯ বছর বয়সী রোসাঞ্জেলা দা সিলভাই তাঁকে তরুণ রাখেন।
অক্টোবরে তিনি যদি পরাজিত হন, তবে যে গৌরবময় সমাপ্তি তিনি চান, তা হয়তো পাবেন না। তবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অটুট থাকবে।
২০২৪ সালে এএফপিসহ বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘এই দেশে আমার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট আর কেউ নেই।’
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24