এম.এ আরিফ চৌধুরী, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
তিন বছরের সম্পর্ক, স্ত্রী পরিচয় ও কাবিনের আশ্বাস—সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর ভুক্তভোগী আঁখিকে সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগ
রংপুরের মিঠাপুকুর থানাধীন মমিনপুর গ্রামের সাংবাদিক মোরশেদ আলী মারুফ (৫০)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে বিয়ের আশ্বাসে এক নারীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীকে হেয় করার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম আঁখি বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোরশেদ আলী মারুফ আঁখিকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। এ সময় বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আঁখি। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তাদের কাবিন হওয়ার কথাও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের হাতে থাকা বিভিন্ন তথ্য, যোগাযোগের উপাত্ত ও অন্যান্য নথিপত্রের কথা জানা গেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মোরশেদ আলী মারুফ রংপুরের মিঠাপুকুর থানাধীন মমিনপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মৃত আব্দুল ওয়াহেদ এবং মাতা মোসলেমা খাতুন।
পরবর্তীতে তিনি খিলগাঁও থানাধীন একলার তালতলা চৌধুরীপাড়ার পাপিয়া হোসেন সম্পাকে বিয়ে করেন। পাপিয়ার পিতা মৃত শওকত হোসেন এবং মাতা মৃত মমেনা খাতুন।
অভিযোগে পাপিয়ার পারিবারিক সম্পত্তি ও চারতলা বাড়ি নিয়েও বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ওই বাড়ির মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ রয়েছে এবং বর্তমানে এ নিয়ে মামলা চলমান। বাড়িটির মালিকানা বর্তমানে নয়জনের মধ্যে রয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে সম্পত্তির মালিকানা, অর্থ লেনদেন এবং চলমান মামলার বিষয়ে আদালতের নথি ও সরকারি রেকর্ড যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষের দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
অভিযোগকারীদের দাবি, পাপিয়া হোসেন সম্পার পারিবারিক সম্পত্তি ও বাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হয়েই মোরশেদ আলী মারুফ তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে পাপিয়া মোরশেদ আলী মারুফকে নিজের বাবার মতো সম্বোধন করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পাপিয়া শুনেছিলেন মোরশেদ আলী মারুফ অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারের সন্তান এবং তার বিপুল জমিজমা, গাড়ি ও বাড়িসহ প্রচুর সম্পদ রয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এমনকি সংসারে আর্থিক চাহিদা ও আয়-ব্যয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে নিয়মিত অশান্তি হতো বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো—দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যেই মোরশেদ আলী মারুফ একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতেন বলে অভিযোগ।
তার অভিযোগ, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোরশেদ আলী মারুফের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘ এই সময়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হতো। সম্পর্কের ওপর বিশ্বাস রেখে তিনি মোরশেদ আলী মারুফকে বিভিন্ন সময়ে অর্থ প্রদান করেন বলে দাবি করেছেন।
আঁখির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভবিষ্যতে বিয়ের বিষয়েও তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কাবিন করার কথাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে সম্পন্ন হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মোরশেদ আলী মারুফের অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি তার স্ত্রী পাপিয়া হোসেন সম্পা জানতে পারেন। বিষয়টি জানার পর সংসারে উত্তেজনা ও বিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
একপর্যায়ে স্ত্রী আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে মোরশেদ আলী মারুফকে ভয় দেখান এবং গলায় দড়ি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আঁখিকে নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক বক্তব্য প্রচার করে তাকে সমাজের কাছে খারাপ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
আঁখির দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে সম্পর্ক বজায় রাখার পর এখন তার চরিত্র ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এমনকি তাকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যও প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অস্বীকার করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন আঁখি।
ভুক্তভোগী আঁখির অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক বজায় রেখে তাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া, বিয়ের আশ্বাস দেওয়া এবং তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পর হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তার প্রশ্ন—যদি সম্পর্কটি মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে এত দীর্ঘ সময় ধরে কেন তা বজায় রাখা হয়েছিল এবং কেন তাকে বিয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল?
অন্যদিকে, মোরশেদ আলী মারুফের পক্ষ থেকে এ অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাংবাদিক মোরশেদ আলী মারুফের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোরশেদ আলী মারুফ ও আঁখির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, কথোপকথন, অর্থ লেনদেন এবং বিয়ের আশ্বাসের বিষয়ে বিভিন্ন প্রমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে রয়েছে।
তবে এসব প্রমাণের সত্যতা যাচাই, অর্থ লেনদেনের নথি পরীক্ষা, ডিজিটাল যোগাযোগের উৎস নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া ছাড়া অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে অর্থ নেওয়া, একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে হেয় করার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
তাই এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24