
প্রবাস জীবন থেকে দেশে ফিরে কোয়েল পাখির খামার করে টাঙ্গাইলের শামীম এখন সফল উদ্যোক্তা। প্রতিমাসে এখন তার আয় ৩ লক্ষ টাকা।
জীবনে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে অনেকেই অনেক ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য করেন। আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা একটু ব্যতিক্রমী চিন্তা-ভাবনা থেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ভিন্ন কিছু পেশা বেছে নেন। তেমনি এক পাখি প্রেমী মানুষ টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার শামীম আল মামুন।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের উদ্যোক্তা শামীম আল মামুন প্রবাসে চাকরি করার সময় ইউটিউব ও ফেসবুকে কোয়েল পাখির খামার নিয়ে ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই অনুপ্রেরণাকেই বাস্তবে রূপ দিয়ে আজ তিনি একজন সফল কোয়েল খামারি। বর্তমানে কোয়েলের বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করে প্রতি মাসে তিন লক্ষ টাকা আয় করছেন তিনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের উদ্যোক্তা শামীম আল মামুনের কোয়েল পাখির খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারের কোয়েল পাখির পরিচর্য়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সে। এ কাজে জন ৫ কর্মী তাকে সহযোগিতা করছে। কেউ পাখির খাবার দিচ্ছে, কেউ ডিম সংগ্রহ করছেন। এ সময় শামীমের সাথে কথা হয় বাসস’র প্রতিবেদকের সঙ্গে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে সফলতার গল্প তুলে ধরে শামীম বাসস’কে বলেন, ২০০৫ সালে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে একটি পানির কারখানায় কাজ করতেন। একদিন কাজ শেষে টেলিভিশনে শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় একটি কোয়েল খামারের প্রতিবেদন দেখে শামীমের একটি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন জেগে ওঠে। ২০১১ সালে ৬ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে তিনি বগুড়ায় গিয়ে অভিজ্ঞ খামারিদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কোয়েল পাখি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
তিনি জানান, ২০১২ সালে বাড়ি সংলগ্ন ২০ শতাংশ জমিতে প্রথমে ৫শ’টি কোয়েলের বাচ্চা দিয়ে ‘সোনার বাংলা সোনালী অ্যান্ড কোয়েল হ্যাচারি’ নামে খামারের কার্যক্রম শুরু করেন। এ কাজে তাকে তার স্ত্রী সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন। কঠিন পরিশ্রম ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই খামারে কোয়েলের সংখ্যা ১২ হাজারে পৌঁছে যায়।
এ সময় তার সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ খামারটি দেখতে আসা শুরু করেন।
উদ্যোক্তা শামীম জানান, বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল রয়েছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার হ্যাচিং ডিম সংগ্রহ করা হয়। এসব ডিম ১৭ দিন ইনকিউবেটরে রাখার পর বাচ্চা ফোটানো হয়।
প্রতি মাসে প্রায় ২ লক্ষ কোয়েলের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে সরবরাহ করেন তিনি।
প্রতিটি বাচ্চা ৭ থেকে ৮টাকা দরে বিক্রি করা হয় এবং প্রতিটিতে ২ থেকে ৩টাকা লাভ থাকে শামীমের। সব মিলিয়ে তার এখন মাসিক আয় ৩ লাখ টাকা।
শামীম জানান, ২০২০ সাল পর্যন্ত কোয়েল ও ডিম বিক্রি করে ব্যবসা ভালোই চলছিল তার। হঠাৎ করোনাকালে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও শামীম নতুন পথ খুঁজে নেন। ২০২৩ সালে তিনি কোয়েলের হ্যাচারি চালু করেন, যা তার ব্যবসায় নতুন গতি এনে দেয়।
এরপর আর তার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
শামীম আরো জানান, এ খামারটিতে সে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে কাজ করছেন। খামারই এখন সফলতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় যেন উৎপাদন ব্যাহত না হয়, সেজন্য একটি জেনারেটরের ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি। এছাড়া পাখির খাদ্য প্রস্তুতের জন্য নিজস্ব ফিড তৈরির মেশিনও স্থাপন করেছেন।
তার সফলতা দেখে অনেকেই কোয়েল পালন শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ খামার দেখতে আসেন এবং তাদেরও খামার করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
খামার পরিদর্শনে আশা জুয়েল মিয়া জানান, শামীম ভাই অল্প পুঁজি দিয়ে কোয়েল পাখির খামার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। আমি তার কাছ থেকে কোয়েল পাখির খামার গড়ার পরামর্শ নিতে এসেছি। তার পরামর্শে আশা করি স্বাবলম্বী হতে পারবো।
অপর দর্শনার্থী জুনাইদ হোসেন বলেন, আমি খামারটি ঘুরে দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। শামীম ভাইয়ের খামার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তার পরামর্শ নেয়ার পর আমি একটি কোয়েল পাখির খামার শুরু করার কথা ভাবছি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, কোয়েল পাখির খামার একটি লাভজনক ব্যবসা।
ডিম থেকে ফোটার ৬ থেকে ৭ সপ্তাহের মধ্যেই লেয়ার জাতের কোয়েল ডিম দেয়া শুরু করে এবং প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত ডিম দেয়। অন্যদিকে ব্রয়লার জাতের কোয়েল মাত্র ৪ সপ্তাহেই বাজারজাত করা যায়। একটি কোয়েল বছরে গড়ে ২৮০ থেকে ৩শ’টি ডিম দেয়। যদি কেউ কোয়েল পাখি খামার করেন তাহলে তার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাদের মাধ্যমে আরও নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। যেটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই জরুরি। তবে যে অঞ্চলে এটির ভোক্তা বেশি সেই অঞ্চলে এমন খামার করলে বেশি লাভবান হওয়া যায়।
সখীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বাসস’কে বলেন, কোয়েল পালন একটি সম্ভাবনাময় খাত। এর ডিম ও মাংস পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলক কম। মুরগির জন্য ব্যবহৃত ভ্যাকসিন দিয়েই কোয়েলের চিকিৎসা করা সম্ভব। শামীম আল মামুন এ উপজেলার একজন অনুকরণীয় সফল উদ্যোক্তা। কোয়েল পাখির রোগ-বালাই কম এবং সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদা থাকায় লাভবান হওয়া যায় খুব সহজে।
তিনি বলেন, অনেকে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য কোয়েল পাখি পালনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। বেকার যুবকদের শামীমের মতো কোয়েল পালনের পরামর্শও দেন এ কর্মকর্তা।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24