‘ব্ল্যাক সুগারকেইন’ বা কালো আখ চাষ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বর্তমানে গাজীপুরে এই আখ চাষে দেখা দিয়েছে ব্যাপক সাফল্য।
ক্রমাগত লোকসান, চিনিকলের কাঁচামাল সংকট ও উৎপাদন খরচের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত মুনাফার ঘাটতির কারণে দেশের অনেক কৃষক আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। ঠিক এ সময়ই কৃষিখাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এই ‘ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন’ বা ফিলিপাইনের কালো আখ।
সাধারণ মানুষের কাছে এ আখ ‘ব্ল্যাক সুগারকেইন’ বা ‘ব্ল্যাক রুবি’ নামে পরিচিত। দেশের উচ্চতর কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) জাতটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়ে রিলিজ করেছে ‘বিএসআরআই আখ ৪৯’ হিসেবে।
কৃষির বৈচিত্র্যায়ন ও বেসরকারি খাতে গবেষণার অংশ হিসেবে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সাকাশ্বর মধ্যপাড়া এলাকায় বসুন্ধরা এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বেসিল) গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ এই আখ চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মাঠ গবেষণায় দেখা গেছে, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে, কম খরচে এই আখের দ্বিগুণ ফলন লাভ করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় আখ চাষিদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটছে, অন্যদিকে দেশের বাণিজ্যিক ও চিবিয়ে খাওয়া আখের বাজারে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
গাজীপুরের ইক্ষু আবাদের বর্তমান চিত্র ও নতুন জাতের আগমন
গাজীপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গুড় উৎপাদনকারী ও চিবিয়ে খাওয়ার আখের চাষ হয়ে আসছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জেলা ইক্ষু আবাদের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে বর্তমানে মোট ১,৬০৩ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। উপজেলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি আবাদ রয়েছে কাপাসিয়ায় ১,২২০ হেক্টর জমিতে।
এছাড়া শ্রীপুরে ১৮৯ হেক্টর, গাজীপুর সদরে ১০০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৬০ হেক্টর ও কালিয়াকৈরে ৩৪ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হচ্ছে।
জাতভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, জেলায় সবচেয়ে বেশি ৫৪২ হেক্টর জমিতে ঈশ্বরদী-১৬ জাতের আবাদ হচ্ছে।
পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়ার জনপ্রিয় জাত বিএসআরআই আখ ৪১ (অমৃত) ৩৮৪ হেক্টর, বিএসআরআই আখ ৪২ (রংবিলাস) ৩২৯ হেক্টর ও বিএসআরআই আখ ৪৭ ১৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। স্থানীয় ও প্রচলিত জাতের মধ্যে টেনাই (৮০ হেক্টর), স্থানীয় জাত (৩৮ হেক্টর), বিএসআরআই আখ ৪৬ (২৭ হেক্টর), চিমাইল (২২ হেক্টর), বিএসআরআই আখ ৩৭ (২০ হেক্টর) ও ঈশ্বরদী-৩৬ (১১ হেক্টর) জমিতে চাষ করা হচ্ছে।
প্রচলিত এসব জাতের ভিড়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিএসআরআই আখ ৪৯ (ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন’)। গাঢ় বেগুনি-কালচে রঙের ব্যতিক্রমী উপস্থিতি, অতি রসালো কাণ্ড ও চিবিয়ে খাওয়ার সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি কৃষকদের পাশাপাশি ভোক্তাদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
বেসিল-এর গবেষণামূলক প্রকল্প ও চারা রোপণ প্রযুক্তি
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বসুন্ধরা এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেসিল) কালিয়াকৈরের সাকাশ্বর এলাকায় ১০ একর গবেষণামূলক জমিতে বিভিন্ন শস্যের পাশাপাশি ২০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন চাষ শুরু করে।
প্রকল্পটির মাঠ গবেষণার দায়িত্বে থাকা ফয়সাল আহমেদ বাসসকে জানান, ব্ল্যাক সুগারকেইন চাষে নতুন রোপণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক সফলতা মিলেছে। প্রচলিত চাষ পদ্ধতিতে দুই থেকে তিন ফুট দূরে চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে চারা থেকে চারার দূরত্ব কমিয়ে ১ থেকে ১.৫ ফুট ও সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩ ফুট রাখা হয়। এতে বিঘাপ্রতি প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কাটিং বা চারা রোপণ সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি বলেন, চারার ঘনত্ব বাড়লেও গাছের উচ্চতা বা ব্যাসে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং প্রতি বিঘায় দ্বিগুণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
ফয়সাল আহমেদ বলেন, রোপণের মাত্র আট মাসেই গাছগুলো ১০ থেকে ১১ ফুট লম্বা হয়ে যায় এবং ১২ মাস পূর্ণ হলে এগুলোর উচ্চতা দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ ফুট। প্রতি ১০-১৪ দিন পর পর নিচের পুরনো পাতা ভেঙে কেবল ৬-৮টি পাতা রাখা হলে আখ রোগবালাইমুক্ত থাকে ও দ্রুত বাড়ে। দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি অথবা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এই আখ রোপণের সেরা সময়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই আখের জমিতে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করা যায় এবং কীটনাশকের ব্যবহার একেবারেই কম লাগে।
বিএসআরআই আখ ৪৯-এর বৈশিষ্ট্য ও বৈজ্ঞানিক পুষ্টিগুণ
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইনচার্জ ড. নিলুফার ইসলাম আখের জাতটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, কৃষকেরা যেটিকে ব্ল্যাক সুগারকেইন নামে চেনেন, সেটি মূলত বিএসআরআই উদ্ভাবিত ও অনুমোদিত ‘বিএসআরআই আখ ৪৯’ জাত।
ড. নিলুফার ইসলাম বলেন, বিএসআরআই আখ ৪৯ মূলত চিবিয়ে খাওয়া বা জুস বানানোর উপযোগী একটি জাত। এতে পানির পরিমাণ বেশি এবং সুগারের (চিনির) পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।
তিনি আরো বলেন, চিবিয়ে খাওয়ার দিক থেকে বিএসআরআই আখ ৪৯ অতুলনীয়। এর বহিরাবরণ বেশ নরম ও গিটগুলো তুলনামূলক কোমল হওয়ায় এটি অতি সহজে চিবিয়ে খাওয়া যায়। একটি পরিপক্ক আখের ব্যাস হয় ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার এবং একক আখ থেকে ১.৫ থেকে ১.৮ লিটার পর্যন্ত পুষ্টিকর রস পাওয়া সম্ভব।
এই জাতের সর্বোচ্চ গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ১৭১ টন পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষণাগারের সূত্রে জানা গেছে, বিএসআরআই আখ ৪৯-এর ১০০% আখের রসে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) পাওয়া গেছে মাত্র ৪০, যা বিএসআরআই আখ ৪২-এর জিআই (৪৪) থেকে কম এবং এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ‘লো-জিআই’ সীমার অন্তর্ভুক্ত। ফলে সাধারণ আখের তুলনায় এটি রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়াবে না। এছাড়া এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও লিভার সুরক্ষায় কার্যকর। পাশাপাশি এর রসে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, জিংক ও আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের সমৃদ্ধ উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অর্থনৈতিক লাভ ও চাষিদের জন্য বিশাল সম্ভাবনা
ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন (বিএসআরআই আখ ৪৯) চাষ কৃষকদের জন্য এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সংকেত দিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে প্রথম বছরে চাষ, চারা ও পরিচর্যা বাবদ মোট আনুমানিক ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে এক বিঘা জমি থেকে ১৫ থেকে ১৮ টন আখ উৎপাদিত হয়, যা বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ফলে প্রথম বছরেই সব খরচ বাদ দিয়ে একজন কৃষকের নিট মুনাফা থাকে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।
এই আখের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘মুড়ি আখ’ বা ‘রেটুন’ ফলনের ক্ষমতা। প্রকল্পের পরিচর্যাকারী শ্রমিক রমজান মন্ডল ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একবার চারা রোপণ করার পর প্রথম বছরের ফসল কাটার পর গোড়া থেকে পুনরায় ১০ থেকে ১৫টি নতুন চারা গজায়। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে নতুন করে জমি তৈরি বা চারা কেনার কোনো খরচ থাকে না।
এতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে বিঘাপ্রতি নিট লাভের পরিমাণ বেড়ে দুই লাখ টাকা থেকে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত হয়। মাত্র একবার বিনিয়োগ করে পর পর তিন বছর নিশ্চিন্তে মুনাফা ঘরে তোলার এমন সুযোগ বাংলাদেশের কৃষিতে বিরল।
শিল্প সম্ভাবনা ও সরকারের নীতি সহায়তা
বেসিলের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান এম. জেড. হোসেন আরজু বাসসকে বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রায় ৪শ’ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই আখ চাষের পরিকল্পনা করছে। শুধু কাঁচা আখ হিসেবে বাজারে বিক্রি নয়, বরং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আখের তৈরি পানীয় (জুস), প্রিমিয়াম মানের গুড় ও বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কাগজ শিল্পের কাঁচামাল তৈরির বৃহৎ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত বোতলজাত জুস ও গুড় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুরাইয়া সুলতানা মাঠ পরিদর্শন শেষে বাসসকে বলেন, ‘আমি নিজে বেসিলের গবেষণা মাঠ পরিদর্শন এবং আখটি খেয়ে দেখেছি। এটি অত্যন্ত মিষ্টি, নরম ও রসালো। এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার ‘চুইং ভ্যারাইটি’।
তিনি আরও বলেন, ‘কম খরচ ও কম পরিশ্রমে তিন বছর ধরে উৎপাদন পাওয়া যায় বলে এটি কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের কারিগরি ও রোগবালাই দমনে সর্বাত্মক পরামর্শ দিচ্ছি।’
তবে এই জাতের ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রসারে কিছু আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। বেসিল কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষকদের মাঝে চারা বিক্রি বা বিতরণ এবং ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে সুবিন্যস্তভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়া বিএসআরআই আখ ৪৯ (ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন) গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য এক নতুন দিগন্ত হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি-বেসরকারি সঠিক সমন্বয়, কৃষকদের সহজ শর্তে প্রশিক্ষণ ও বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের অবকাঠামো তৈরি করা গেলে এই বিশেষ আখ আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24