
ঢাকার আরবান হিট আইল্যান্ড বা তাপমাত্রা কমাতে ভবনে ছাদবাগান ও দেয়ালে ভার্টিকেল গার্ডেনিংয়ে উৎসাহিত করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে শহরাঞ্চলে ছাদবাগান করতে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলাবদ্ধতা দূর করতে প্লাবন ভূমি, বন্যা প্রবাহ অঞ্চল ও সংরক্ষিত জলাশয়গুলো ভরাট বা দখল ঠেকাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।
রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর হাজারীবাগ ও লালবাগে ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট গ্রিন অ্যাকশন প্ল্যান (সিআরজিএপি) সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পুরোনো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও গ্রিন অ্যাকশন প্ল্যান সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা- বাসসকে বলেন, নগরীর তাপমাত্রা কমাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর বনায়ন এবং ঢাকা শহরের শিরা-উপশিরার মতো খালের পাড়ে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। ঘনবসতি এলাকায় ছাদবাগান কিংবা ভার্টিকেল গার্ডেনিংকেও উৎসাহিত করতে হবে। অন্যথায় এ নগর বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।
অন্যদিকে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মাহফুজা আক্তার বাসস’কে বলেন, মেগা প্রজেক্ট পূর্বাচল নতুন শহরকে দেশের প্রথম পরিকল্পিত গ্রিন ও স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বিশাল লেক সংরক্ষণ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট (এসটিপি) এবং ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজউকের লক্ষ্য শুধু সংখ্যার বিচারে বেশি ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা নয়, ঢাকার ভবিষ্যৎ নগরায়নকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও টেকসই পথে পরিচালিত করা। ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ এবং আকস্মিক জলাবদ্ধতার মতো ঝুঁকিগুলো আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করছি। রাজউকের মূল কাজ হলো, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এমন একটি নগর অবকাঠামো তৈরি করা, যা এই জলবায়ু ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে পারে।
রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম ঢাকা মহানগর প্রসঙ্গে বলেন, জলবায়ুবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে সমন্বিত জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজউকের নতুন আইন এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধনে এই দু’টি বিষয় মাথায় রেখেই আইনি কাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নের বড় বাধা হলো সমন্বয়হীনতা। গুলশান-বনানী লেক দূষণমুক্ত করা কিংবা নিয়ম না মেনে তৈরি ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ওয়াসা, ডেসকোসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-২০৩৫) একটি জলবায়ু ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা উল্লেখ করে নগর পরিকল্পনাবিদ মাহফুজা আক্তার বাসসকে বলেন, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকাকে ‘ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক’ (জলাশয় ও সবুজের সমন্বয়) হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যেখানে আধুনিকতা ও প্রকৃতির একটি টেকসই ভারসাম্য থাকবে।
তিনি জানান, ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল নির্ধারণ করে নিখুঁত হাইড্রোলজিক্যাল অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সব ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হবে।
মাহফুজা আক্তার বলেন, জলাধার সংরক্ষণ নীতিমালার আওতায় ঢাকার ভেতরে ও চারপাশের বিদ্যমান সমস্ত পুকুর, খাল, ডোবা ও প্লাবন ভূমিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেন কোনোভাবেই এগুলো ভরাট করা না যায়। এটি শহরের পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়াবে এবং আকস্মিক জলাবদ্ধতা দূর করবে। শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে জলাশয় ও লিনিয়ার পার্কের সমন্বয়ে ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকার সব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এক নয়, বিশেষ করে পুরান ঢাকার মতো ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ কারণেই সিআরজিপির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে হাজারীবাগ ও লালবাগ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের পর যে বিশাল পরিবেশগত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করে সেখানে পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয় ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি এবং লালবাগের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরে রেখে জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোই সিআরজিপির মূল লক্ষ্য। এই প্ল্যানের আওতায় জলবায়ু ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে এবং ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (ইউপিআর) সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। নতুন নকশা অনুমোদনের সময় প্রতিটি বহুতল ভবনে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা এবং বিধিমালা অনুযায়ী পানি সরাসরি মাটিতে শোষিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তিনি জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আবাসন খাতের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করে আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জলাধার, বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে রাজউক ছাড়াও দু’টি সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পরিবেশ অধিদপ্তর নিজ নিজ আইনি পরিধিতে কাজ করে।
রাজধানীতে অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে উল্লেখ করে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিককালে নির্মিত বহুতল এই ভবনগুলোর অধিকাংশই গ্লাস দিয়ে আচ্ছাদিত। ভবনটিকে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত করায় ভবনের বাইরে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। শহরের প্রাকৃতিক জলাধার ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারিয়ে গেছে। এর ফলে উষ্ণতা শোষণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহরের ইতিহাস চারশ’ বছরেরও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে শহরের বিস্তৃতি নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর পর্যন্ত হলেও নতুন করে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং জিয়া উদ্যানের মতো নতুন কোনো পার্ক বা উদ্যান তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হলো এলাকাভিত্তিক পার্ক, রিটেনশন পন্ড তৈরি করা। নতুন নতুন ভবন তৈরিতে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও গ্রিন বিল্ডিং মেটেরিয়ালসকে উৎসাহিত করতে হবে।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24