অবৈধভাবে বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে কঠোর বিধান রেখে কার্যকর করা হয়েছে বিদ্যমান ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন।
এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তিকে আদালত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তার দখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সেই জমির দখল পুনরুদ্ধার করা যাবে। এই আইনে মামলা করে সুফল পাচ্ছেন জনগণ।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে ঢাকা জেলায় এই আইনে মোট ৮০৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ৪৭৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৩৩২টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। দায়েরকৃত মামলার সিংহভাগই অবৈধভাবে দখলচ্যুত ব্যক্তির দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় দখল পুনরুদ্ধারের বিস্তারিত পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তাহার দখলীয় ভূমি হতে উচ্ছেদ করা হলে, তিনি দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত করা হয়েছে মর্মে সন্তুষ্ট হলে, তাকে তার পূর্ব-দখলীয় ভূমিতে দখল পুনর্বহাল করতে যথাযথ আদেশ প্রদান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ ও সরেজমিন তদন্ত করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, যথাযথভাবে নোটিশ জারি করা সত্ত্বেও কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকলে সরেজমিনে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করার পর লিখিত আদেশ দেওয়া যাবে।
এ আইনের অধীনে কোনো আবেদন প্রাপ্তির পর হতে তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, দখল পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং কোনো কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ তাতে অসহযোগিতা বা অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি নিজে বা নিয়োজিত কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করতে পারবেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সংশ্লিষ্ট জেলার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন বা অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে আদেশ জারি করতে পারবেন।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে বলা হয়েছে, কোনো দেওয়ানি আদালতে দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত কোনো মামলা বিচারাধীন থাকলে একই বিষয়ে এই ধারার অধীন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত আদালত তার নিকট দায়েরকৃত বা বিচারাধীন কোনো মামলা তার কোনো পক্ষের আবেদনক্রমে বা স্বীয় বিবেচনায় এই ধারার অধীন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট পাঠাতে পারবেন।
আদেশ অমান্যে দণ্ড: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনটির ধারা ৮-এর অধীন প্রদত্ত কোনো আদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য বা লঙ্ঘন করেন বা তা বাস্তবায়নে বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন, তাহলে উক্তরূপ কার্য হবে একটি অপরাধ, এবং এজন্য তিনি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার উপসচিব তুষার আহমেদ বাসসকে বলেন, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ প্রণয়নের পর ২০২৪ সালে এর বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধিমালা যথাযথভাবে পরিপালনের মাধ্যমে আইনটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার সুফল পাচ্ছে জনগণ।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে একটি আলাদা টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে জমা পড়া আবেদনগুলো আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিটুস লরেন্স চিরান বলেন, এই আইনের আওতায় ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা জেলায় ৮০৭টি মামলার মধ্যে ৪৭৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটদের এখতিয়ার নির্ধারণ করে দিয়েছি। নিয়োজিত সকল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সর্বাত্মক আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেদখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আইনজীবী খালিদ হোসাইন বলেন, এই আইনের সবচেয়ে বড় দিক হলো জবাবদিহিতার বিধান। আগে দেওয়ানি মামলায় ৫-১০ বছর সময় লাগত, এখন ৯০ দিনে দখল পুনরুদ্ধারের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিকার পাচ্ছেন।
এই আইনের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিন বলেন, আদালতের আদেশ ছাড়াই আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। আমি প্রতিকার চেয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করি। পরে তিন মাসের মধ্যেই জমির দখল ফেরত পেয়েছি। এটা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে গেলে বছরের পর বছর সময় লাগত। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিকার পেয়েছি।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24