
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আর এ দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন নরসিংদীর প্রতিমা শিল্পীরা। শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় বাঁশ, কাঠ, খড় ও কাদামাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমার কাঠামোর কাজ প্রায় শেষের দিকে।
কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ ও কারুকাজের শেষ ধাপ, আবার কোথাও প্রতিমায় দেয়া হচ্ছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। এরপর প্রতিমাগুলো অলংকার ও সাজসজ্জায় সজ্জিত করে মণ্ডপে নেয়ার প্রস্তুতি শুরু হবে।
এ দুর্গোৎসবকে ঘিরে নরসিংদীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ প্রতিমা তৈরিতে প্রতিমা শিল্পী ও কারিগররা এখন ব্যস্ত রয়েছেন।
সরেজমিনে নরসিংদী সদর উপজেলার কয়েকটি প্রতিমা তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করে তাতে কাদামাটির প্রলেপ দেয়া হচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়ার পর মাটির ওপর সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হচ্ছে। কোথাও দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের অবয়ব তৈরির কাজ চলছে। আবার অনেক প্রতিমায় ইতোমধ্যে রং করার কাজ শুরু হয়েছে। শিল্পীরা নিখুঁতভাবে প্রতিমার চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক ও বিভিন্ন অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলতে অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিমা শিল্পীরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রতিমার চাহিদা ও দাম কিছুটা ভালো। তবে, প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রংসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে কারিগর ও শ্রমিকদের মজুরিও। ফলে, প্রতিমার দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না প্রতিমা শিল্পীরা।
নরসিংদী সদর উপজেলার সেবা সংঘ এলাকার প্রতিমা শিল্পী সবুজ দাস বাসস’কে বলেন, ‘অন্যান্য বছরের মতো এবারও প্রতিমার চাহিদা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও কারিগরদের মজুরি বেশি হওয়ায় প্রতিমা তৈরিতে খরচ বেড়েছে। এ কারণে প্রতিমার দামও কিছুটা বেশি পড়ছে।’
তিনি বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় কয়েক মাস আগে থেকেই। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করে কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকানোর পর রং ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করে প্রতিমা মণ্ডপে পাঠানো হয়। দুর্গাপূজার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন কাজের চাপ অনেক বেড়েছে।
প্রতিমা শিল্পীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, একটি প্রতিমা তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। প্রতিমার আকার, নকশা ও কারুকাজের ওপর নির্ভর করে এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বড় ও বিশেষ নকশার প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। ফলে এসব প্রতিমার দামও তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে।
এদিকে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদ। নরসিংদী জেলায় এবার ৩৬১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মণ্ডপের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ।
নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাখন দাস বাসস’কে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করার আশাবাদী। নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। জেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।’
পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি পূজামণ্ডপকে নিরাপত্তার আওতায় আনার পাশাপাশি মণ্ডপের আশপাশের পরিবেশ, বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পূজা চলাকালে দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল ও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে। পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব ২২ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে। উৎসবকে ঘিরে এরইমধ্যে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
প্রতিমা শিল্পীদের ব্যস্ততা আর পূজা উদযাপন পরিষদের প্রস্তুতিতে নরসিংদীতে এখন শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহ তৈরি হতে শুরু করেছে। প্রতিমা তৈরির শেষ ধাপের কাজ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পীরা। একইসঙ্গে নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রত্যাশায় রয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24