নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা আমরা করতে পেরেছি। চাইলেই এখন কেউ গল্প-গুজবভিত্তিক প্রতিবেদন করতে পারে না’— বলতেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার সূচনা তার হাত ধরে। শুধু সূত্রের নাম উল্লেখ করে সংবাদ লেখা এবং যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের চর্চা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাকে অগ্রণী মানেন সহকর্মীরা। বাংলাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতায় এমন অনেক ‘প্রথম’-এর জন্ম দিয়ে চিরবিদায় নিলেন তিনি।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাবেক সহকর্মী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও শিক্ষক আফসান চৌধুরী বলেন, নৈর্ব্যক্তিকভাবে সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠকের কাছে নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎস হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অবস্থান ধরে রাখা ছিল তৌফিকের বড় অবদান।
বিবিসির পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও তৌফিক খালিদীর সঙ্গে কাজ করেছেন আফসান চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে অনেকের অবস্থানের পরিবর্তন হলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এখনও ‘সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য’। আমি কোনো নিউজ এখনও, আজও এত বছর পরেও যদি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে না হয়, আমি অন্য জায়গায় এটা বিশ্বাস করতে পারি না।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে আফসান চৌধুরী বলেন, যে জিনিসটা ও করতে পেরেছিল অনেকটাই, সেটা হচ্ছে এই নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিউজ করা— এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা অন্যরা পারে না। অন্যরা পার্টিসিপেন্ট হয়ে যায়, অংশীদার হয়ে যায় নিউজের ভালো-মন্দের মধ্যে। কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের নিউজ মেকিংটা সবসময় অবজেক্টিভ ছিল। কলাম ও মতামত লেখার ক্ষেত্রে ভিন্ন বিষয় থাকলেও সংবাদকে বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে যেতে দেননি তৌফিক।
আফসান চৌধুরী বলেন, ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, আমি প্রতিদিন প্রথম এইটা পড়ি। এইটা যে কত বড় একটা অর্জন চিন্তা করা যায় না। একসময় হয়ত এটা এককভাবে অনলাইন মিডিয়া হিসেবে ছিল এবং সেই কারণে এটা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, যে আধুনিক এই ডিজিটাল মিডিয়া— এইটা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর প্রথম করেছে এবং সফলভাবে করেছে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, তৌফিক অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি মানসম্মত ও প্রতিশ্রুতিশীল জায়গায় নিয়ে গেছেন। প্রায় বন্ধ হতে যাওয়া বিডিনিউজকে তিল তিল করে গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক মানের একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে রূপান্তর করেছিলেন তৌফিক। দ্রুত বা চটকদার খবর না দিয়ে কিছুটা দেরিতে হলেও শতভাগ যাচাই করা সত্য খবর প্রকাশ করাই ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মূল নীতি, যাতে কোনো খবর ভুল প্রমাণিত হয়ে প্রত্যাহার করতে না হয়।
এমনকি টেলিভিশনের অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে তৌফিক সেদিকে পা বাড়াননি বলেও জানান তিনি।
অনেক ‘প্রথম’-এর সূচনা
২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নবযাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতার নতুন যুগের সূচনা হয়।
২০০৬ সালে বার্তা সংস্থাটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বদলের পর প্রতিষ্ঠানটি খোল-নলচে বদলে যায়। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানিতে রূপ দেয়।
আফসান চৌধুরী বলেন, ‘তৌফিকের বড় যেটা অর্জন, এর আগে যারা ছিল, তারা কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে ওভাবে সামাল দিতে পারেনি। তৌফিক এসে সেটা করেছিল, প্রচুর মানুষকে সে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল এবং ওই সময় যখন আমি জয়েন করেছিলাম, তখন বহু পরিকল্পনা হচ্ছিল। তখন মানুষকে ডিজিটাল মিডিয়া বোঝানো কঠিন ছিল। তৌফিকও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিষয়টি বোঝাতেন এবং পরে প্রতিষ্ঠানটি সফল হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর শুধু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নয়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংবাদমাধ্যম এবং ২৪ ঘণ্টা সচল নিউজরুমেরও নতুন যুগের সূচনা হয়।’
প্রতিষ্ঠানের ষোড়শ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, “আমরা জেগে থাকি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই, সবসময়ই। আমরা কখনোই ঘুমাই না। আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন আমরা দেশের একমাত্র নিউজরুম ছিলাম, যা কখনোই ঘুমাত না।”
‘সবার আগে নির্ভুল খবর’— এই মন্ত্রে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে দ্রুতই পাঠকের মনোযোগ কাড়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পাতায় প্রায় কোটি অনুসারীও পাঠকের সেই আস্থার একটি চিত্র তুলে ধরে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে এরপর শিশুদের জন্য প্রথম বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট ‘কিডজ’ চালু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ইউনিসেফের সঙ্গে মিলে শিশু সাংবাদিকদের প্রথম ওয়েবসাইট ‘হ্যালো’ও আসে প্রতিষ্ঠানটির হাত ধরে।
চালু হয় মোবাইল ফোনে ব্রেকিং নিউজ সেবা, যা ছিল দেশে প্রথম। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে বাংলায় সংবাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
চাপের কাছেও মাথা নত নয়
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পথচলা সব সময় মসৃণ ছিল না। এক ব্যবসায়ীর মামলা ও বিচার নিয়ে প্রকাশিত পুরোনো খবর সরাতে রাজি না হওয়ায় ডজন ডজন মামলার মুখে পড়েও প্রতিষ্ঠানটি মাথা নোয়ায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় পাঁচ বছর ধরে হয়রানির শিকার হন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে মামলাটি প্রত্যাহার হয়।
২০১৮ সালে একজন সেনাপ্রধানের ভাইয়ের পরিচয় সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ করায় অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়।
পরে আরেকটি চক্রের ইন্ধনে ২০২৩ সালে ওয়েবসাইটটি এক মাস বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বন্ধ হয়ে যায়নি।
চাপের মুখেও মাথা নত না করার কথা তৌফিক নিজেই বলেছিলেন। ২০২৪ সালে অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে তিনি বলেন, “সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বোধহয় উল্লেখযোগ্য একটা লড়াই আমরা করেছি। মাথানত করবার মত অবস্থা আমরা হতে দেইনি; আমরা মাথা নত করিনি। আগামী দিনগুলোতেও আমরা টিকে থাকব মাথা উঁচু করেই। আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতা, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও ব্যবসায়ীদের চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “চেষ্টা হয়েছে, চরম অন্যায় করা হয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে। দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, রাজনৈতিক নেতারা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, আমাদের ক্ষতি করবার চেষ্টা করেছেন। অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছে, হয়রানি করেছে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে লড়াইটা চালিয়ে গেছি।”
দীর্ঘ পথচলায় চড়াই-উতরাইয়ের স্মৃতিচারণ করে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, “আমরা সবসময় ভালো থাকি না, মাঝেমাঝে খুব ভালো থাকি, কখনও কখনও খুব যন্ত্রণায় থাকি, কষ্টে থাকি। তারপরও আমরা ভেসে থাকার চেষ্টা করি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করি, জেগে থাকার চেষ্টা করি।”
২০২২ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সহকর্মী ও পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “এখনও টিকে আছি, বেঁচে আছি, ভেসে আছি, সেটাই যথেষ্ট।”
তরুণদের হাতে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন
প্রতিষ্ঠানের ১৮ বছর পূর্তির সময় নতুন নেতৃত্বের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন তৌফিক খালিদী।
তিনি বলেছিলেন, “আমাদের ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, টানা ১০ বছর বাংলাদেশের সবচেয়ে পঠিত সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আমি ছিলাম। তখন পর্যন্ত আমরা কোনো রকম বিতর্ক ছাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদমাধ্যম ছিলাম।”
তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম, আমার সরে দাঁড়ানো উচিত। গত আট বছরে সেই পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারিনি, আমি পারিনি।”
তরুণদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “তরুণদের হাতে আমি দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলাম। আমি আশা করব, খুব দ্রুত তরুণ কেউ দায়িত্ব নেবে। আমাদের অনেক সহকর্মী আছেন, যারা অত্যন্ত যোগ্য, অত্যন্ত দক্ষ, কর্মঠ।”
“তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে। আর তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।… আমি বিশ্বাস করি, এখন যারা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, তারা আগামী ১৮ বছর এটা পরিচালনা করবে। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।”
সেই ইচ্ছাপূরণ দেখার আগেই ৫৯ বছরে হঠাৎ এপারের যাত্রা সাঙ্গ হলো তৌফিক ইমরোজ খালিদীর।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে ১ অক্টোবর রাতে তাকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
সূত্র: বিডিনিউজ
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24