
বিশ্বজুড়ে ‘প্যাসিফ্লোরা’ নামে সুপরিচিত হলেও স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এটি আনারকলি ফল হিসেবে পরিচিত। আনারকলি ফলটির উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চলে। বিশেষ করে টক জাতীয় এ ফলটি কক্সবাজারে আসা পর্যটককেদের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় এরইমধ্যে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে আনারকলির চাষাবাদ শুরু হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মেহেরপুরের কৃষক মো. মিঠু ইউটিউবে অন্যের বাগানে আনারকলি বা প্যাশন ফ্রুটের ছবি দেখে আনারকলি ফল চাষে উদ্ভুদ্ব হন। পরিচিত ফল নয়, চাষের অভিজ্ঞতাও নেই। তবু নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই সাহস করে আনারকলি ফল চাষে নেমে পড়েন তিনি।
চলতি বছর দেড় বিঘা জমিতে ২৩০টি চারা লাগানোর পাঁচ মাসের মধ্যেই গাছে আসে ফুল ও ফল। এখন বাগানের মাচায় ঝুলছে কাঁচা-পাকা আনারকলি। নতুন এ ফলের চাষে প্রথম সাফল্য মিঠুর চোখে এখন বড় স্বপ্নের ছবি আঁকছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের মিঠু ছোটবেলা থেকেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিকের পড়াশোনা শেষ করে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে নেমে পড়েন। এতোদিন শুধু সবজি, আম, কলা ও পেয়ারা চাষ করেছেন তিনি।
তবে গতানুগতিক চাষাবাদের পাশাপাশি নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই ইউটিউবে বিভিন্ন ফসল ও ফলের চাষের ভিডিও দেখতেন। একপর্যায়ে তার সামনে আসে প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি চাষের ভিডিও। আর এ সময় ফলটির চাষপদ্ধতি, গাছের পরিচর্যা ও বাজারদর সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের ভিডিও দেখে শুধু জানবেন না, নিজের জমিতেই পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করবেন।
মিঠু বাসসকে বলেন, ‘নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই আনারকলি চাষ শুরু করেছি। ইউটিউবে দেখে এবং কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জমি প্রস্তুত করি। প্রথমদিকে ভয় ছিল-ফল হবে তো? এখন গাছে ফল দেখে সেই ভয় অনেকটাই কেটে গেছে।’ জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি প্রস্তুত করে তাতে জৈব সার মেশাই। এরপর ঝিনাইদহ থেকে ২৩০টি চারা এনে দেড় বিঘা জমিতে রোপণ করি। বেড়ে ওঠা লতানো গাছগুলো বাঁশের তৈরি মাচায় তুলে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মিঠুর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের মাচাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সবুজ লতা। পাতার ফাঁকে ফুটে আছে ফুল। কোথাও ছোট কাঁচা ফল, কোথাও আবার পেকে উঠেছে আনারকলি। বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত মিঠু। নতুন ফল দেখতে আশপাশের মানুষও মাঝেমধ্যে তার বাগানে আসছেন।
মিঠু জানান, আনারকলি গাছে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত পরিচর্যা ও মাচার ব্যবস্থা করতে হয়। চারা রোপণের প্রায় পাঁচ মাস পরই গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। জমি প্রস্তুত, চারা কেনা, মাচা তৈরি ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি।
আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বাগান থেকে ফল বিক্রি শুরু করার আশা করছেন মিঠু। বাজারে চাহিদা ও দাম ভালো থাকলে এ মৌসুমে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পারবেন বলে তার প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, ‘বাজারের চাহিদা ও ভালো দাম পেলে আমাদের জেলার কৃষকরা এ ধরনের লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহী হবেন। আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে অন্যান্য কৃষকরা আনারকলি চাষে উৎসাহিত হবেন।
গোভীপুর গ্রামের কৃষক এনামুল হক বাসসকে বলেন, প্রথম দিকে নতুন ধরনের এ আনারকলি ফলের চাষ দেখে গ্রামের মানুষ তেমন একটা বুঝতে পারেননি। এখন গাছে প্রচুর ফুল ও ফল দেখে তাদের দিন দিন আগ্রহ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম হলে এ ফলের চাষ কৃষকদের জন্য ভালো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাই কৃষি অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়ার দাবি জানাই।
মিঠুর বাগানে আসা সাইয়েদাতুন নেসা নয়ন বাসস’কে বলেন, মেহেরপুরে আনারকলি চাষ হচ্ছে শুনে বাগান দেখতে এসেছেন। আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলটি দেখেছেন, এবার সামনে থেকে দেখলেন। ফল দেখতে সুন্দর এবং খেতেও ভালো লেগেছে বলে জানান তিনি।
মাহমুদা আক্তার নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘এটা আমাদের এলাকার নতুন ফল। কৌতূহল থেকেই দেখতে এসেছি। ফল দেখতে সুন্দর, স্বাদও ভালো। এ ধরনের নতুন ফলের চাষ বাড়লে কৃষকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
মিঠুর এ বাগানকে ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। কেউ জানতে চাইছেন চাষের পদ্ধতি, কেউ দেখছেন ফলের আকার ও গাছের বৃদ্ধি। মিঠুর এ সাফল্য শুধু তার নিজের জমির হিসাব নয়; মেহেরপুরের কৃষিতে নতুন কোনো ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না, তারও এক ধরনের পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এ আনারকলি বাগান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কাজী শাহনেওয়াজ বাসস’কে বলেন, মেহেরপুরে এ ফলের চাষ সফল করতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে। স্থানীয় পরিবেশে ফলটির সম্ভাবনা বিবেচনা করে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে।
তিনি বলেন, কৃষিতে নতুন ফসল যুক্ত হওয়ার এ প্রবণতা মেহেরপুরের কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মিঠুর দেড় বিঘার বাগান এখন শুধু আনারকলির ফলন দেখাচ্ছে না; দেখাচ্ছে পরিচিত কৃষির বাইরে একটু ঝুঁকি নিয়ে নতুন কিছু করার সম্ভাবনাও।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24