
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আগামী সাত বছরের বাজেট নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। বাজেটে বড় অঙ্কের ব্যয়ছাঁট করা হবে কি না, তা নিয়ে দুই দেশের মতবিরোধের কারণে আলোচনা বছরের শেষ সময়সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ইইউর লক্ষ্য বড়দিনের আগেই বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। কারণ আলোচনা বিলম্বিত হলে, তা ইউরোপের কয়েকটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের বছরে গড়াতে পারে। এতে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনী সাফল্য ভবিষ্যতে জোটের সদস্যদের মধ্যে সমঝোতা অর্জনকে কতটা কঠিন করে তুলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশন ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত সাত বছরের জন্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর বাজেট প্রস্তাব করার পর সমঝোতার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২১ থেকে ২০২৭ মেয়াদের বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউরো।
বাজেটের আকার ও ব্যয় নিয়ে ইউরোপ গভীরভাবে বিভক্ত। জার্মানির নেতৃত্বে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন বাজেট থেকে কয়েক শ বিলিয়ন ইউরো কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স মনে করে, ২৭টি সদস্যদেশের এই জোটকে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। ফ্রান্স ইইউর বাজেটে অর্থ প্রদানকারী অন্যতম প্রধান দেশ।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ব্যাপক ব্যয়ছাঁটের দাবির সমালোচনা করেছেন।
গত মাসে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি উচ্চাভিলাষী ইউরোপীয় বাজেট প্রয়োজন। ইইউর অগ্রাধিকারগুলো, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে সহায়তা দিতে আমাদেরকে আরও শক্তিশালী ইউরোপীয় বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।’
বর্তমানে ইইউর পর্যায়ক্রমিক সভাপতির দায়িত্বে থাকা আয়ারল্যান্ড শনিবার বাজেটের একটি সংশোধিত প্রস্তাব প্রকাশ করবে। দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য কমিয়ে সমঝোতার পথ তৈরি করাই এই প্রস্তাবের লক্ষ্য।
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ ও কঠিন এই আলোচনার শেষ পর্যায়ে বড় ধরনের সংঘাত ও ছাড় দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া প্রায় অনিবার্য।
এর মধ্যে আগামী ডিসেম্বরের সময়সীমার মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কাও বাড়ছে।
আগামী মাসে স্পেন আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
-সমঝোতায় পৌঁছানোর তাগিদ নিয়ে সবার মধ্যে ঐকমত্য-
শনিবার বাজেটের সংশোধিত প্রস্তাব প্রকাশের আগে এ নিয়ে চলা জল্পনা-কল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন ইউরোপের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক।
তিনি বলেন, ‘এই কাজটি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সবার মধ্যেই তাগিদ রয়েছে।’ এ পর্যায়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করাকে খুব একটা ফলপ্রসূ মনে করেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে আইনি দিক থেকে চলতি বছরই বাজেট চূড়ান্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। বাজেট অনুমোদনের চূড়ান্ত আইনি সময়সীমা ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত।
শনিবারের সংশোধিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে টানা দুই দিন বৈঠকে বসবেন ইইউর নেতারা। সেখানে বাজেট নিয়ে তীব্র দর-কষাকষি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধ শুধু ব্যয়ছাঁটের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। আরেকটি পক্ষও নিজস্ব দাবি নিয়ে আলোচনায় রয়েছে।
দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১৭টি দেশ ‘ফ্রেন্ডস অব কোহেশন’ বা ‘সংহতির পক্ষে বন্ধুরা’ নামে একটি জোট গঠন করেছে। তাদের দাবি, কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।
ব্যয়সংকোচনের পক্ষে থাকা দেশগুলোর প্রধান আপত্তি হলো, সদস্যদেশগুলোকে যখন নিজেদের ব্যয় কমাতে হচ্ছে, তখন প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের সহায়তা ও ইউরোপীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অর্থ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ইউরোপের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা যাবে।
গত আগস্টে জার্মানি ও অন্য পাঁচটি ব্যয়সংকোচনপন্থী সদস্যদেশ এমন এক সময়ে ইইউর বড় বাজেটের প্রস্তাবের সমালোচনা করে, যখন জোটের দেশগুলোকে কঠোর আর্থিক সংযমের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
এদিকে, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের রাজনৈতিক অবস্থানও চাপের মুখে রয়েছে। দেশটিতে উগ্র ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের নির্বাচনী উত্থান তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
নতুন কর থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা
ফ্রান্সও নিজস্ব বাজেটসংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন জাতীয় ঋণের বোঝা কমানোর একটি ওপায় হিসেবে ইইউর বাজেটে ফ্রান্সের আর্থিক অবদান কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাব হলো, সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি অর্থ নেওয়ার পরিবর্তে রাজস্বের নতুন উৎস তৈরি করা।
এ লক্ষ্যে বড় কোম্পানির ওপর কর আরোপ, ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ওপর শুল্ক ও তামাকজাত পণ্যের কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ব্রাসেলস।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন জুয়াব্যবস্থার ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে।
ডিজিটাল খাতের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবও অনেক দেশের সমর্থন পাচ্ছে না।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24