কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী ধারাবাহিক অভিযানে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধ আড্ডা, মোটরসাইকেল মহড়া ও প্রকাশ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা কমেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে রোববার সন্ধ্যা থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত জেলার ১৮টি থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৫৩ জনকে আটক করেছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা শাখা সম্মিলিভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
সোমবার সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান অভিযানের বিষয়টি বাসস’কে নিশ্চিত করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক অভিযানে আলোচিত ‘র’, ‘ক্রাইম সেটআপ’, ‘স্ম্যাশ স্কোয়াড’, ‘গ্যাং-১২০৭’ ও ‘চঢ ১০’সহ বিভিন্ন গ্যাংয়ের ৯ জন নেতৃস্থানীয় সদস্যসহ মোট ২ হাজার ৯৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
তাদের অনেককে অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বাসস’কে বলেন, কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। আটক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও নজরদারি রাখা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিক অভিযানের পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রকাশ্য তৎপরতা কমেছে। পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ায় অনেক স্থানে আগের মতো দলবদ্ধ আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া এবং প্রভাব বিস্তারের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। অভিযানের কারণে কয়েকটি গ্যাংয়ের সদস্যদের আত্মগোপনে যাওয়ার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা রেহেনাজ বেগম বাসস’কে বলেন, কাঠেরপুল, ধানমন্ডি রোড, ৫ নম্বর গলি, জোড়া বিল্ডিংসহ আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের উৎপাত নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ ছিল। এসব এলাকায় চলাচল করতে গিয়ে বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে বাইরে বের হলে ভোগান্তিতে পড়তে হতো। নারীদের উত্ত্যক্ত করা, মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।
নগরীর চকবাজার এলাকার অটোরিকশাচালক সাইফুল মিয়া বাসস’কে বলেন, পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের পর নগরীতে ছিনতাই, উত্ত্যক্ত করা এবং বখাটেদের দলবদ্ধ আড্ডা আগের তুলনায় কমেছে বলে মনে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে অভিযান নিয়মিত না হলে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নগরীর টমছমব্রিজ, সালাহউদ্দিন রোড, ঠাকুরপাড়া, বিসিক এলাকা, ধর্মপুর, রেসকোর্স, কাঠেরপুল, হাউজিং এস্টেট, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, কাপ্তানবাজার, অশোকতলা, পার্ক রোড, মোগলটুলি, নবাববাড়ি রোড, ইপিজেড রোড, মেডিকেল কলেজ রোড, শাসনগাছা, কাটাবিল, নুরপুর, কোটবাড়ি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাদুঘর রোড, সালমানপুর ও সানন্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সময়ে ‘ঈগল গ্রুপ’, ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’, ‘র’, ‘ক্রাইম সেটআপ’, ‘স্ম্যাশ স্কোয়াড’, ‘গ্যাং-১২০৭’, ‘চঢ ১০’, ‘এলআরএন’, ‘সিবিক’, ‘মডার্ন’, ‘রকস্টার’, ‘ডিস্কো বয়েজ’, ‘বস’, ‘রয়েল বেঙ্গল’, ‘সিজলিন’, ‘জে অ্যান্ড জে’, ‘বিগ ব্রাদার’, ‘টুইস্ট’, ‘ব্ল্যাক স্টার’, ‘ডার্ক’, ‘আরজিএস’, ‘সিএমসি’ ও ‘কিং স্কোয়াড’সহ বিভিন্ন নামে গ্রুপের অস্তিত্বের কথা আলোচনায় এসেছে। তবে এসব নামের সব গ্রুপ বর্তমানে সক্রিয় কি-না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ ঘটনার পর কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে জেলা পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর ‘র’ গ্রুপের প্রধান হিসেবে পরিচিত ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গ্রেফতার করা হয়। নগরীর মিশনারি স্কুলের সামনে ২০২২ সালে শাহাদাত হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সে প্রধান আসামি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এছাড়া কক্সবাজার ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘র’ গ্রুপের ইমরান হোসেন রতন (১৯) ও সাইফুল ইসলাম (২০) এবং ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্রুপের মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ (২৪) ও রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’ (২৪) নামে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বাসস’কে বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
আত্মগোপনে থাকা গ্যাং লিডারদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24