
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ইরানে মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, তেহরান সতর্ক করে বলেছে, আবার যুদ্ধ শুরু হলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।
এমন এক সময়ে এ ঘটনা ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ নির্বাচন ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর তার নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প—এমন জল্পনা নাকচ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যা চাই, সবই যেন পেয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রস্তুত, আমরাও প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় আছি। তবে হয়তো হামলা চালানোর কোনো কারণই থাকবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’ রয়েছে।
দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, হামলার পরও ইরানের ‘বৈধ আত্মরক্ষার’ অধিকার রয়েছে।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার সরকার এখনো ‘সংলাপের মাধ্যমে’ সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আবার যুদ্ধ শুরু হলে ‘কেউ লাভবান হবে না।’
পেজেশকিয়ান আরও জানান, যেসব বিষয় নিয়ে আগে আলোচনা করা সম্ভব ছিল না, সেগুলো নিয়েও আলোচনার জন্য দেশটির সর্বোচ্চ নেতা সম্প্রতি সরকারকে নতুন ক্ষমতা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলার খবর প্রকাশের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানে হামলার কথা স্বীকার করেন।
‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘তারা একটি বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি করেছিল স্থাপনাটির নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গত রাতে আমরা সেখানে সফলভাবে হামলা চালাই।’ তিনি একে ‘ছোটখাটো হামলা’ বলে উল্লেখ করেন।
‘ইরান সমঝোতা চায়’-
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে এ যুদ্ধ অচলাবস্থায় রয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এএফপিকে জানিয়েছেন, সর্বশেষ হামলার ঘটনায় ইসরাইল জড়িত ছিল না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে কেশম দ্বীপে হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ‘হতে পারে’। যুদ্ধ এবং এর কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ে গণঅসন্তোষ এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান যত দ্রুত সম্ভব একটি সমঝোতা চায়।’
গালিবাফ বলেন, ইরান তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যুদ্ধ ঠেকানোর দায়িত্ব এখন ‘যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে কাতার। দেশটি জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসানে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির বিষয়ে তারা এখনো আশাবাদী।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের দেওয়া প্রস্তাব ও ধারণাগুলো উভয় পক্ষ বর্তমানে পর্যালোচনা করছে।’
তিনি বলেন, ‘এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে বলে আমরা আশাবাদী।’ এ লক্ষ্যে দোহা ‘একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির জন্য’ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া-
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি এবং ট্রাম্প দুজনই আশাবাদী।
সোমবার ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অবশ্যই কিছুটা অগ্রগতি করেছি। দেখা যাক, আরও কিছুটা এগোনো যায় কি না।’
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দুই দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত। তবে এ জন্য ওয়াশিংটনকে ইরানের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো মেনে নিতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরে ইরান প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল। এর শর্তগুলোর মধ্যে ছিল সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধ প্রত্যাহার।
তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘দুই দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ইরানের সদিচ্ছার আরেকটি প্রমাণ।’
মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে হুমকি অব্যাহত রেখেছিলেন। রোববার তিনি বলেন, কোনো এক অনির্দিষ্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানকে ‘হাতুড়ির আঘাত’ দিতে হতে পারে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তাকে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু ‘নিষ্ক্রিয় করার বিষয়টি দেখতে হবে’। এর মধ্যে রয়েছে মধ্য ইরানের কথিত পরমাণু স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। তবে তেহরান সেখানে কোনো পরমাণু স্থাপনা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
ওয়াশিংটন আবার যুদ্ধ শুরু করলে ব্যাপক পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে ইরানের কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে আসছেন।
সম্পাদক : মো: মাসুদ পারভেজ, মোবাইল : 01712-983974, অফিস : রহমান ম্যানসন, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০, ই-মেইল : citizennews786@gmail.com
© All rights reserved 2019-2026 CitizenNews24