ফকির মিরাজ আলী শেখ, বিশেষ প্রতিনিধি:
শাকসবজি বিক্রি ও অটোরিকশা চালিয়ে চলছে পাঁচ সদস্যের সংসার, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগের দাবি।
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। কাঁধে ছিল অস্ত্র, বুকে ছিল দেশপ্রেম আর চোখে ছিল মাতৃভূমিকে রক্ষার অদম্য শপথ। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিহাসে সেই মানুষটিকেই আজ জীবনের শেষ বয়সে অটোরিকশার স্টিয়ারিং ধরতে হয়েছে। কখনও গ্রাম-গঞ্জের ঝোপঝাড় থেকে শাকপাতা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন, আবার কখনও সারাদিন অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম করেন।
তিনি অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স কর্পোরাল মো. রফিকুল ইসলাম (৬৬)। তাঁর বাড়ি দিনাজপুর জেলার খেতাবগঞ্জ উপজেলার খেতাবগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদপাড়া বড়হাট এলাকায়। তিনি মরহুম শাহাবুদ্দিনের পুত্র। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক পেনশন মাত্র ৮ হাজার ৪০০ টাকা।
মো: রফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমান বাজারদরে এই সামান্য পেনশন দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা অসম্ভব। তাই বার্ধক্যের ক্লান্ত শরীর নিয়েও প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাঁকে। ভালো কোনো বসতঘর নেই, নেই আলাদা রান্নাঘর কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম। একটি ছোট ঘরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে।
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন,
দেশের জন্য জীবনের সেরা সময় দিয়েছি। কখনো ভাবিনি শেষ জীবনে জীবিকার জন্য অটোরিকশা চালাতে হবে, শাকপাতা বিক্রি করতে হবে। বর্তমান পেনশনে সংসার চালানো অসম্ভব। চিকিৎসা করাতে পারি না, ঘর মেরামত করতে পারি না। আমরা কোনো দয়া চাই না, চাই দেশের জন্য কাজ করা একজন সৈনিকের ন্যায্য সম্মান ও নিরাপদ জীবন।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র যদি অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের জন্য যুগোপযোগী পেনশন, উন্নত চিকিৎসা, আবাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, তাহলে হাজারো সাবেক সৈনিকের পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।
অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আনোয়ার হোসেন বলেন,
রফিকুল ইসলাম আমাদের গ্রামের মানুষ। তাঁর জীবনসংগ্রাম আমি খুব কাছ থেকে দেখি। একজন সৈনিকের শেষ জীবনের এমন কষ্ট সত্যিই মর্মান্তিক। দেশের জন্য যাঁরা নিজেদের যৌবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের যেন শেষ জীবনে অভাবের কাছে হার মানতে না হয়। সরকারের কাছে আমাদের আন্তরিক আবেদন, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের জন্য একটি শক্তিশালী কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।
এদিকে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সার্জেন্ট (অব.) মো. তাইজাল হক তাজু বলেন,
আজ ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) রফিকুল ইসলামের চোখের জল শুধু একজন সৈনিকের নয়, এটি বাংলাদেশের হাজারো অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও তাঁদের পরিবারের নীরব কান্না। কর্মজীবনে তাঁরা সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, নিজের পরিবারকে সময় না দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ অবসরের পর তাঁদের অনেকেই অর্থকষ্ট, চিকিৎসাহীনতা, বাসস্থানের সংকট ও সীমিত পেনশনের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের সন্তান আর্থিক সংকটে পড়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক পরিবার চিকিৎসার অভাবে নীরবে কষ্ট পাচ্ছে। যে সৈনিক একদিন দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন, আজ তাঁর পরিবার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না।
আমরা সরকারের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানাই, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের জন্য যুগোপযোগী পেনশন কমিশন গঠন, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা, আবাসন সুবিধা, তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা, কর্মসংস্থান এবং বিশেষ কল্যাণ তহবিল গঠন করা হোক।
আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশের জন্য আত্মত্যাগী এসব অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। দেশের জন্য যাঁরা তাঁদের যৌবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের বার্ধক্য যেন অভাব-অনটন ও অসহায়ত্বে না কাটে। একজন সৈনিকের সম্মান রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের সম্মান রক্ষা করা।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, রফিকুল ইসলামের জীবনসংগ্রাম কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি দেশের বহু অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের বাস্তব চিত্র। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগী এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
রফিকুল ইসলামের গল্প একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়, এটি সেই সব সৈনিকের গল্প, যাঁরা একদিন দেশের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। আজ তাঁদের শেষ জীবনে প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ, সম্মান এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।