দেশের নারীরা বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছেন। অনেক নারী ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই, বাশঁ-বেতের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরিসহ হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বরগুনার খাকদোন নদীতে প্রতিদিন বৈঠা হাতে যাত্রী পারাপার করে জীবন সংসারের হাল ধরেছেন নারী মাঝি লিলি আক্তার (৪৫)। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছাস, প্রচন্ড শীত কিংবা নদীর উত্তাল স্রোতও তার পেটের ক্ষুধার তাড়না ঠেকাতে পারে না তার বৈঠা চালানো। এ বৈঠা দিয়েই চলে তার সংসার ও অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসা।
বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া গ্রামের মৃত ফটিক উদ্দিনের মেয়ে লিলি আক্তার নদীর পাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে মা পারুল বেগমকে নিয়ে বসবাস করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢলুয়া-ফুলতলা নৌপথে যাত্রী পারাপার করেন তিনি। জনপ্রতি ভাড়া নেন মাত্র ৫ টাকা। দিনভর পরিশ্রম করে তার সর্বসাকুল্যে আয় হয় মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।
মাত্র ৮ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে নৌকা চালানো শেখেন লিলি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এরপর বাবার নৌকা নিয়েই খাকদোন নদীতে যাত্রী পারাপার শুরু করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে বৈঠা চালাতে চালাতে তার দুই হাতে পড়েছে ছোপ ছোপ কালো দাগ আর ফোঁসকা। প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা নদীতে নৌকা চালিয়ে তার জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
লিলি আক্তার বাসস’কে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার ৮ বছর যখন বয়স তখন থেকেই খেয়া বাওয়া শুরু করি। বাবার কাছ থেকেই শিখেছি নৌকা বাওয়া। প্রতিদিন বৈঠা চালিয়ে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পাই। এ দিয়ে সংসার চালাব, নাকি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করাব বুঝতে পারি না। তিনবেলা খাবার, মায়ের ওষুধ জোগার (ব্যবস্থা) করতে হিমশিম খাইতে হয়।
তিনি জানান, একসময় সংসার করার স্বপ্ন দেখলেও স্বামীর জুয়া ও মাদকাসক্তির কারণে তার দাম্পত্য জীবন ভেঙে যায়। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এখন বৃদ্ধ মাকে নিয়েই তার সংসার চলে।
লিলির দুঃখ করে করে, নদীপথে বর্তমানে যাত্রী কমে যাওয়ায় তার আয়ও কমে গেছে। কয়েক কিলোমিটার দূরে সেতু নির্মাণের পর নৌকায় যাত্রী আরও কমে গেছে। তাই এখন তার স্বপ্ন, নৌকায় একটি ইঞ্জিন, অথবা ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি মা-মেয়ের মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘরের দাবি জানান সরকার ও বিত্তবানদের কাছে।
তিনি আপক্ষেপ করে বলেন, গত ৭ দিন আগে তাদের বসত ঘড়টি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীভাবে আগুন লেগেছে তা তিনি জানেননা।
লিলির খেয়ায় নিয়মিত যাত্রী ও বরগুনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জাকির হোসেন বাসস’কে বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে লিলিকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় টিকে থাকতে হচ্ছে। তার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে লিলি প্রতিদিন নৌকা চালান। তার পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘর দেয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রতিবেশী জায়েদা খাতুন লিলির কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, তাকে সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে ছোট একটি দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন।
বরগুনা সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও পূর্ব গর্জন বুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেন মাসুম বাসস’কে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারী মাঝি লিলি আক্তারের একটি বসতঘর ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা অতি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আজিজ বাসস’কে বলেন, আমরা লিলির পরিবারের জন্য শুকনো খাবার দিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি সহায়তা তার প্রাপ্য অনুযায়ী খুব শিঘ্রই পেয়ে যাবে। এ মুহূর্তে ঘড়ের জন্য টিন স্টকে নেই বরাদ্দ এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাকে দেয়া হবে।
বরগুনার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা খাকদোন নদীর স্রোতের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে চলা লিলির জীবন যেন এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। তার চাওয়া মাকে নিয়ে বসবাসের জন্য একটি ঘর, মায়ের চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার জন্য স্থায়ী একটি জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 



















