নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ
৫ মার্চ, ২০২৬
রাজধানী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক নববাণী’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের পদ থেকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, নীতিবহির্ভূত আচরণ এবং চরম স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে মোঃ আতাউর রহমান-কে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আজ ৪ মার্চ, ২০২৬ তারিখে পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক এ. এন. এম সলিমুল্লাহ সরকার স্বাক্ষরিত এক পত্রে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক এ. এন. এম সলিমুল্লাহ সরকার জানান, গত ৫ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে আতাউর রহমানকে কেবল মৌখিকভাবে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সে বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেন।
প্রকাশকের অভিযোগ অনুযায়ী, আতাউর রহমান প্রকাশকের অনুমতি বা কোনো আলোচনা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো পত্রিকার লোগো পরিবর্তন করেছেন। এছাড়াও তিনি প্রকাশকের অগোচরেই বিভিন্ন সম্পাদক, সাংবাদিক ও অফিস স্টাফ নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি পূর্বের কর্মরত কয়েকজন সম্পাদক মণ্ডলীকে কোনো প্রকার নোটিশ বা প্রকাশকের অনুমতি ছাড়াই অবৈধভাবে অব্যাহতি দিয়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে যে, আতাউর রহমান তার নিজস্ব অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তিনি বিজয় টিভির গাইবান্ধা প্রতিনিধি ডিপটি প্রধান-কে প্রকাশকের অনুমতি ছাড়াই ‘প্রধান সম্পাদক’ হিসেবে নিয়োগ দেন। এবং সিলেটের বিতর্কিত ব্যক্তি খায়রুল আলম সুমনকে ‘যুগ্ম সম্পাদক’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ বাণিজ্য শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন, যার কোনো হিসাব মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই। এছাড়া মোস্তফা কামাল নামে একজনকে মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন। এসব মাধ্যমে তিনি অবাধে সংবাদ প্রকাশ করে গেলেও প্রকাশক এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন।
প্রকাশক অসুস্থ থাকার সুযোগে মোস্তফা কামাল ও তার সহযোগীরা মিলে পত্রিকাটিকে একটি ‘ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত করেছিলেন।
অব্যাহতি পত্রে আতাউর রহমানকে পত্রিকার যাবতীয় অনলাইন পোর্টালের এক্সেস এবং ডিজিটাল সম্পদ অবিলম্বে অফিস বরাবর বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও, মোস্তফা কামালের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সম্পদগুলো হস্তান্তরে টালবাহানা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রকাশক আরও জানান, “আমি অসুস্থ থাকার সুযোগ নিয়ে আতাউর রহমান পত্রিকাটি নিজের দাবি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। যেহেতু আমি প্রকাশক ও সম্পাদক, তাই নিয়ম অনুযায়ী ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলো আমার নামে হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। এমনকি পত্রিকার কোনো বিষয়েই তিনি আমাকে নলেজ দিচ্ছেন না। তার এহেন অসংগতি ও দখলদারিত্বের মনোভাবের কারণেই তাকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হলাম।”
প্রকাশক কর্তৃক জারিকৃত অব্যাহতি পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে: আতাউর রহমানের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পত্রিকার মূল নীতি ও স্বার্থের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তার অসংগতিপূর্ণ কর্মকাণ্ড পত্রিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে আজ ৪ মার্চ থেকেই সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে ইতোমধ্যে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। চিঠিতে আতাউর রহমানের নিয়োগপত্র বাতিল এবং তার সাথে পত্রিকার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি সরকারিভাবে জানানো হয়েছে।
অব্যাহতি পত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আজ থেকে আতাউর রহমান পত্রিকার কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তার কাছে গচ্ছিত পত্রিকার যাবতীয় নথিপত্র এবং অনলাইন পোর্টালের এক্সেসসহ সকল সম্পদ অবিলম্বে অফিস বরাবর বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আতাউর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও উঠেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথে এবং তার পুরো পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নিজের অতীত ঢাকতে তিনি সুকৌশলে গণমাধ্যমের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। প্রকাশক এ. এন. এম সলিমুল্লাহ সরকার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার সুযোগ নিয়ে আতাউর নিজেকে পত্রিকার মালিক দাবি করে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকেন। এমনকি পত্রিকার ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলো নিজের দখলে রেখে প্রকাশককে কোনো তথ্য না দিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখেন। শৃঙ্খলা ভঙ্গের এই দীর্ঘ তালিকার কারণেই তাকে আজ ৪ মার্চ থেকে সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসককে সরকারিভাবে অবহিত করা হয়েছে।
অব্যাহতি পাওয়ার পর আতাউর রহমান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত ৫ মার্চ থেকে তিনি তার ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছেন। এক পর্যায়ে তিনি প্রকাশকের শান্তিবাগের বাসায় সশরীরে গিয়ে পদ ফিরে পেতে প্রথমে নগদ অর্থের প্রলোভন দেখান। তাতে কাজ না হলে তিনি অসুস্থ প্রকাশককে সজোরে হুমকি-ধামকি দিয়ে চলে আসেন। বর্তমানে বিভিন্ন ফোন নম্বর থেকে প্রকাশককে প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থ প্রকাশক সলিমুল্লাহ সরকার এখন নিজ বাড়িতেই জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আতাউরকে পত্রিকার যাবতীয় নথিপত্র এবং অনলাইন এক্সেস অবিলম্বে বুঝিয়ে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা অমান্য করে জবরদখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যমের ছদ্মবেশে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং অসুস্থ ব্যক্তির সম্পদ দখলের এই অপচেষ্টা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে অসুস্থ প্রকাশকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।