এস চাঙমা সত্যজিৎ, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধিঃ
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নিকট পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের পক্ষ থেকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানান এবং সবিনয় নিবেদন করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা হচ্ছে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসীদের দ্বারা ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন বিধিমালা প্রণীত না হওয়ার কারণে অদ্যাবধি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। তাই বর্তমানে অন্তবর্তীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ বহাল রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আইন অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যাবলী যথাযথভাবে হস্তান্তরিত হয়নি। ফলত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ বস্তুত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। সর্বোপরি একদিকে ব্রিটিশ প্রদত্ত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি পার্বত্য চট্টগ্রামে বলবৎ রয়েছে অপরদিকে অপারেশন উত্তরণ নামক এক ধরণের সেনা কর্তৃত্ব তিন পার্বত্য জেলায় কার্যকর রয়েছে। বস্তুত অপারেশন উত্তরণের বদৌলতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নসহ সকল ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনা কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলশ্রুতিতে তিন পার্বত্য জেলায় সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়ন তথা পার্বত্য অঞ্চলের সকল ক্ষেত্রে জটিল ও স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে। তাই পার্বত্যবাসীদের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে।
এমতাবস্থায় নবনির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী ও আরেকজন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচনা করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির “ঘ” খন্ডের ১৯ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে যে, “উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে এবং এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ইহা নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক ও বিধিসম্মত নয় বলে গন্য করা যায়। ফলত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রদত্ত এ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করার ক্ষেত্রে জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে যা কারোর জন্য কাম্য হতে পারেনা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষি চৌদ্দটা উপজাতি স্বতন্ত্র শাসনপদ্ধতি ও জীবনধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসতেছে। ভিন্ন ভাষাভাষি এই জনগোষ্ঠীদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও জীবনধারা সংরক্ষনার্থে ব্রিটিশ উপনিবেশিক সরকার ১৮৬০ সালে থেকে তাদের জন্য বিশেষ আইন প্রনয়ন করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সরকার ও পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে একটি বিশেষ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। বলা বাহুল্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার কারনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধান তথা পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর হতে পারছেনা। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পদে কাউকে পদায়ন করা বিধিসম্মত নয়। অতএব পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের স্বার্থে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট নিম্নোক্ত দাবীসমূহ পেশ করা হল-
১। মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ হতে প্রত্যাহার করা।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে কাউকে পদায়ন না করা।
৩। রোডম্যাপ প্রণয়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের পক্ষে—
স্বাক্ষর করেন রাঙামাটি ২৯৯ নং আসনের সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা (অবঃ উপ সচিব), রাঙামাটির মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা, জুম ইনস্টিটিউট কাউন্সিল (জাক)’র সভাপতি ও বিশিষ্ট লেখক শিশির চাকমা, রাঙামাটির বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ান।