মোঃ নয়ন মিয়া দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধিঃ নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) ১০ এপ্রিল ২০২৬ (শুক্রবার): বিল–২০২৬। এই আইনকে দেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ-এ কণ্ঠভোটে সর্ব সম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়। এর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন,২০০০ কে সময়োপযোগী ও কার্যকর করার পথ সুগম হয়েছে।
বিচার ব্যবস্থায় নতুন গতি ও স্বচ্ছতা সংশোধিত আইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত,স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। দীর্ঘসূত্রিতা ও বিলম্বিত বিচার ভুক্ত ভোগীদের যে মানসিক,সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে,তা দূর করার লক্ষ্যে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে সময়সীমা নির্ধারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুততর হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে।
এ আইন বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত নতুন সংশোধনীতে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা,গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষায় উন্নত ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সময় যাতে তারা পুনরায় ভয় বা হয়রানির শিকার না হন,সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ নারীদের ও শিশুদের বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে এবং তাদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করবে। ফলে নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা আইনটি অপরাধীদের জন্য কঠোর ও সুস্পষ্ট শাস্তির কাঠামো নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে সমাজে শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো স্থান নেই। সরকার এ ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করবে বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা সংশোধিত আইনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।ডিজিটাল প্রমাণ,তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি নির্ভর তদন্ত পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা আরও কার্যকর ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এটি সাইবার অপরাধসহ আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক বিশেষজ্ঞদের মতে,এই আইন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে,বিশেষত লক্ষ্য–৫: জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায়। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি ও মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করবে।সম্মিলিত প্রয়াসের ওপর গুরুত্ব মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মনে করে,আইনের সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রশাসন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী,বিচার বিভাগ,স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান,সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আইনের সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই আইন বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
সমাজে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব এই সংশোধিত আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে,নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে;নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে;বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে;অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে;মানবাধিকার সুরক্ষা আরও সুদৃঢ় হবে;একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২৬ পাস বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি আইন নয়,বরং মানবিকতা,ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতি রাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা হচ্ছে,যেখানে প্রতিটি নারী ও শিশু নিরাপদ,সম্মানিত ও সুরক্ষিত জীবনযাপন করতে পারবে।