জেলার হাকিমপুর উপজেলার পল্লীতে এক বেকার যুবক ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাকে অনুসরন করে এখন অনেক বেকার যুবক এই ধরণের খামারি হতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর উপজেলা সদরের দক্ষিণ বাসুদেবপুর মহল্লার মৃত আলহাজ্ব আব্দুর জব্বারের পুত্র শিবলী নোমান (৩২) এর সাথে কথা বলে জানা যায়, তার বসতবাড়ীর পাশে গড়ে তুলেছেন ছাগলের খামার। নিতান্ত শখের বসেই ৫ বছর আগে ৪টি ছাগল ক্রয় করে লালন-পালনের পর অল্প খরচে বেশি লাভের মুখ দেখে সিদ্ধান্ত নেন ছাগলের খামার গড়ে তুলবেন। যেমনই ভাবনা তেমনি কাজ। হাট থেকে আরো ৮টি ছাগল ক্রয় করে ছাগলগুলো লালন-পালন শুরু করেন।
তিনি জানান, ওই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নিজে দায়িত্বে কাজ করে যাচ্ছেন। এরপর নিজেই ছাগলের পরিচর্যা করতে থাকেন। এখন তার খামারে দেশি ও বিদেশি প্রজাতির মোট ১২০টি ছাগল রয়েছে। যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা। নোমান জানান, ৫ বছর আগে শখের বসে ১৪ হাজার টাকায় ৪টি ছাগল কিনে লালন-পালন শুরু করেন। এরপর এক বছরের মধ্যে ৪টি ছাগল ৬মাস পরপর ৪টি করে মোট ১৬টি বাচ্চা দেয়।
পরে ওই ছাগলগুলো বিক্রি করে ৮৪ হাজার টাকা আয় হয়। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছাগলের খামার করে অনেক আয় করবেন। এরপর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরামর্শক্রমে একটি করে যমুনাপাড়ি, তোজাপাড়ি, হরিয়ান ও ব্লাক বেঙ্গল প্রজাতির ছাগল ক্রয় করে মাচং পদ্ধতিতে খামার গড়ে তোলেন। এখন তার খামারে ৪ প্রজাতির মোট ১২০টি ছাগল রয়েছে। বাড়ির পাশের পতিত জায়গায় আবাদ করেছেন হাইড্রোপ্রোনিক (মাটি ছাড়া ট্রেতে আবাদ করা ঘাস) ঘাস। এই ঘাস ছাগলের জন্য উৎকৃষ্টমানের খাবার।
তিনি জানান, এই গৃহপালিত প্রাণী বছরে ২ বার প্রজনন ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিবার প্রজননে একাধিক বাচ্চা দেয়। ছাগল পালনে রোগ বালাইও কম হয়। বছরে একবার পিপিআর, গডপক্স ভ্যাকসিন দিলেই কোন প্রকার ওষুধ লাগে না। তাই অল্প খরচে বেশি আয় করা সম্ভব। যেখানে একটি বিদেশী গাভী পালন করলে প্রতিদিন ৪শ’ টাকার খাবার খায়। সেখানে ৪শ’ টাকা হলে প্রতিদিন ৪০টি ছাগলকে খাওয়ানো যায়। ছাগলের খাদ্য হিসেবে খাওয়ানো হয় গম, ভুট্টা ও ছোলা বুটের গুড়ো সেই সাথে সয়াবিন ও খড়ের ছানি। যা ছাগলের জন্য খুবই পুষ্টিকর।
তিনি জানান, দেশের বাজারে ছাগলের চাহিদার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই ছাগল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা উপার্জন সম্ভব।
তিনি বলেন,আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার ঈদের জন্য তিনি ২৫টি ছাগল বিক্রি করতে ওই ছাগলগুলো মোটাতাজা করণের জন্য পরিচর্যা করছেন। তার প্রস্তুত করা ছাগলগুলো বিক্রি করে ৪ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা আয় করবেন বলে আশা করছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বাসস’কে জানান, আমরা নিয়মিত ওই ছাগলের খামারে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দিয়ে দিচ্ছি। ছাগলের খামার করে নোমানের সফলতা দেখে এখন অনেকেই খামার গড়ে তোলার পরামর্শের জন্য আমাদের কাছে আসছেন। আমরা বেকারত্ব দূর করতে নতুন করে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে যুবক-যুবতী উভয়কে এসব ছাগল পালনসহ বিভিন্ন ধরনের খামারী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এভাবেই সীমন্তবর্তী এই উপজেলায় একাধিক খামারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে।
হাকিমপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী জানান, তার এলাকায় বেকার যুবক শিবলী ছাগলের খামার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার খামারে এনজিও ব্রাক থেকে ছাগল পালনে স্বল্প সুদে ৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় তারা তাকে অবহিত করেছেন।
জেলার হাকিমপুর উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. কবিরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, সম্প্রতি তিনি তার খামার পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আগামী এক বছরে মধ্যে এই উপজেলায় এ ধরনের আরো খামার গড়ে ওঠার বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্বল্প সুদে উদ্যোক্তা বেকার যুবকদের ঋণ দিয়ে ছাগল পালনে খামার গড়তে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম জানান, তিনি সম্প্রতি হাকিমপুর উপজেলার ছাগল পালনে উদ্যোক্তা যুবক শিবলি নোমানের ছাগলের খামার পরিদর্শন করেছেন। তার উদ্যোগ সফল এবং তিনি ভালো লাভবান হয়েছেন। তাকে অনুসরণ করে ওই উপজেলায় আরো ১০/১৫টি ছাগল পালনের খামার গড়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে এসব খামারিদের ছাগল পালনে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।