এস চাঙমা সত্যজিৎ
ভ্রাম্যমান প্রতিনিধিঃ
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় কেন্দ্রীয়ভাবে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ)’র দুই যুগ পূর্তি পালন করা হয়েছে।
আজ রবিবার (৫ এপ্রিল ২০২৬) সকাল ১০টার সময় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ডিওয়াইএফের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
সভা শুরুর পূর্বে ইউপিডিএফ ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন যথাক্রমে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’র সংগঠক তানিমং মারমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জিকো ত্রিপুরা।
এর পর শহীদদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ও শহীদদের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
এতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে সংগঠক তানিমং মারমা ও বরুন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো ত্রিপুরা ও কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক মিঠুন চাকমা।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বাত্তশাসনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর “যুবশত্তি গর্জে ওঠো, সরকারী বিপ্লবীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে পূর্ণস্বাত্তশাসনের লড়াই জোরদার করো” এই আহ্বানে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জিকো ত্রিপুরা।
গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বরুণ চাকমার সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফ সংগঠক তানিমং মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মারমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক মিঠুন চাকমা।
ইউপিডিএফ সংগঠক তানিমং মারমা বলেন, ‘যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার’। তাই যুব সমাজকে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হবে। যুবকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি জাতির মুক্তির আন্দোলনকে জোরদার ও সমাজ পরিবর্তন করতে পারবে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের দমন-পীড়ন চলমান রয়েছে। সরকার বদল হলেও পাহাড়ের পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় না। এ পরিস্থিতিতে যুব সমাজকে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে একমাত্র ইউপিডিএফ লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তিনি যুব সমাজকে ইউপিডিএফে নেতৃত্বে চলমান পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কি পরিস্থিতি তা আমরা সকলে জানি। অধিকার পাওয়ার জন্য আমাদের অবশ্যই সংগ্রাম করতে হবে। অতীতে পাহাড়িদের এই এলাকা স্বাধীন ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হওয়ার পর থেকে এ অঞ্চলের পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা এখনো চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের পাহাড়িদের বাঙালি বানানো হয়েছে। এই নিপীড়ন নির্যাতন, বঞ্চনা, বৈষম্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই আমাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের মা-বোনদের প্রতিনিয়ত ধর্ষণ-নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। এখন এখানে সীমান্ত সড়ক হয়েছে। তাই আমাদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। কারণ দেখা যাবে সেটলার বাঙালিরা এই সড়কের আশে-পাশেই বসতিস্থাপন করবে, পাহাড়িদের জায়গা-জমি বেদখল করবে।
তিনি যুব, নারী সমাজসহ সবাইকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানান।
যুবনেতা সুইচিং মারমা বলেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের দীর্ঘ ২৪ বছর লড়াই সংগ্রামে অনেকে শহীদ হয়েছেন। এ সময়ের আন্দোলনে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কিছু সফলতা রয়েছে। যেমন- ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলুটিলায় ৭০০ একর পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করে পর্যটন জোন বানানোর চক্রান্তের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামসহ স্থানীয় জনগণ তীব্র আন্দোলন করে। এতে সরকার প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয়।
তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যতদিন পর্যন্ত পূর্ণস্বাত্তশাসন অর্জিত হবে না ততদিন পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
ছাত্রনেতা মিঠুন চাকমা বলেন, আজ গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ২৪ বছর অর্থাৎ দুই যুগ পূর্ণ হয়েছে। এই সংগঠনকে আরো গতিশীল হয়ে আগামী দিনের লড়াই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার বদল হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অতীত ফ্যাসিস্ট আমলের মতোই রয়েছে। দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের সবারই লক্ষ্য পাহাড়িদের বিনাশ করা। তারা আমাদের জায়গা কেড়ে নিয়ে, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিতে চায়। তাই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসকগোষ্ঠি তথা সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জিকো ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জায়গা-জমি বেদখল নিয়ে যুব শক্তি একত্রিত হতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশাপাশি বন-প্রকৃতি রক্ষা করা, সমাজে সচেতনা সৃষ্টি, সামাজিক অবক্ষয় রোধ করার ক্ষেত্রে যুব সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি পাহাড়িরা কাজে লাগাতে না পারলেও এ মাটি সেটেলারদের কাছে সোনার চেয়েও দামি। তাই নিজেদের জায়গা-জমি রক্ষা করতে হবে। কোনভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম দীর্ঘ ২৪ বছর আপোষহীনভাবে লড়াই সংগ্রাম করে এসেছে। আগামীতে যুব সমাজকে এ সংগ্রামে যুক্ত হতে হবে। যেখানে ভূমি বেদখল, নারী ধর্ষণ হবে সেখানে এলাকাবাসীসহ যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বেগবান করতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের পতাকাতলে সমবেত হতে যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।