এই মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কম হওয়া সত্ত্বেও, ভালো ব্যবসা ও লাভের আশায় রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ ও বিপণন শুরু হয়েছে।
সোমবার বিকেলে মিঠাপুকুর উপজেলার ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত পদাগঞ্জ গ্রামের এক আম বাগানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম সংগ্রহের উদ্বোধন করেন।
মিঠাপুকুর উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি দপ্তর যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিএই-এর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. লোকমান হেকিম, উপজেলা বিএনপি সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এবং জেলা জামায়াতে ইসলামীর সম্পাদক মাওলানা এনামুল হক উপস্থিত ছিলেন।
পরে, প্রধান অতিথি নিকটবর্তী পদাগঞ্জ স্কুল ও কলেজ মাঠে ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভায় বক্তৃতা করেন।
তিনি কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তারা অত্যন্ত সুস্বাদু স্থানীয় জাতের এই ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের বিপণনে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন ।
তারা স্থানীয় সড়কের উন্নয়ন, ব্যাংকিং সুবিধা, স্থায়ী শেড, বাজারে আম ধোয়ার সুবিধা, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং জিআই পণ্য হিসেবে বিদেশে ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান।
এই সময় জেলা প্রশাসক জানান, ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমকে জেলা প্রশাসনের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আম রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সড়ক সংস্কার, ওয়াশ ব্লক নির্মাণ, ব্যাংক শাখা স্থাপন এবং ম্যাঙ্গো ট্রেন চালুসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
প্রথম দিনে পদাগঞ্জ হাটে বিপুল পরিমাণে ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম আমদানি হয়।
বিক্রেতারা জানান, প্রথম দিনে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের ফলন কিছুটা কম হয়েছে।
তবে, বাগানের আকার বেড়েছে। সেজন্যই কৃষকরা এবার ন্যায্যমূল্য পাবেন।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন যে, ‘শুরুতে দাম কিছুটা কম থাকলেও আমের দাম প্রতিদিন বাড়বে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের বর্ধিত চাষাবাদে রংপুর ও সমগ্র অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, যা শত শত কৃষককে স্বাবলম্বী করেছে।
ডিএই সূত্র অনুযায়ী, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় কৃষকরা সাধারণত ২ হাজার ৫৫৬ হেক্টরের বেশি জমিতে তাদের চাষকৃত বাগান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩৮ হাজার থেকে ৪০হাজার টন ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম উৎপাদন করেন।
এর মধ্যে, শুধুমাত্র রংপুর জেলাতেই প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির বাগান থেকে তারা বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন ‘হাড়িভাঙ্গা’ আম উৎপাদন করেন।
মিঠাপুকুর উপজেলা ছাড়াও রংপুর জেলার বদরগঞ্জ, সদর, পীরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, পীরগাছা, কাউনিয়া উপজেলার কয়েক ডজন গ্রামেও অত্যন্ত সুস্বাদু দেশি জাতের এই আমের চাষ হচ্ছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার কয়েক ডজন গ্রামেও ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের চাষ হয়।
চলতি মৌসুমে শুধু রংপুর জেলাতেই ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ‘হাড়িভাঙ্গা’ আমের চমৎকার ব্যবসা হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তা, চাষি ও ব্যবসায়ীরা।