মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ন
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ::
সিটিজেন নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। যারা আগ্রহী আমাদের ই-মেইলে সিভি পাঠান

গডফাদার সাবেক এমপির ভাগ্নে পরিচয়ে ১৭ বছর ধরে ত্রাসের রাজত্ব

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:

নদীর ঘাটে নৌকার মাঝি কিংবা বাংলা মদের (চুল্লু) সাধারণ ব্যবসায়ী এটাই ছিল দেড় দশক আগের পরিচয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার আর মাদকের কালো টাকার স্পর্শে রাতারাতি যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন তারা। রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর ‘ভাগ্নে’ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচয় দিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ডিমভাঙ্গা ও মাদারপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অপরাধ সিন্ডিকেট। একই পরিবারের এই চার ভাই হলেন মো: মনিরুল ইসলাম মনির, মো: মেহেদী হাসান, মো: আব্দুর রহিম টিসু (টিপু) এবং মো: সোহেল রানা। (এই সিন্ডিকেটে অপর ভাই মাসুদ রানা মাসুমের নামও রয়েছে)।

 

 

​বিগত ১৭ বছর ধরে এলাকায় মাদকের রমরমা বাণিজ্য, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, রেলওয়ের জমি দখল এবং ‘ব্যান্ডার বাহিনী’র মাধ্যমে চাঁদাবাজির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন তারা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও থামেনি তাদের হেরোইন বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কিছু সুবিধাবাদী নেতাকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করে নতুন ‘শেল্টারে’ এখনো বেপরোয়া এই সিন্ডিকেট। সম্প্রতি এসব অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং র‍্যাব সদরদপ্তরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে এলাকাবাসীর পক্ষে মোঃ ফয়েজুল রহমান নামের এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ।

 

 

​রাজনৈতিক প্রভাবে বেপরোয়া উত্থানের ​অনুসন্ধানে ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এক সময় চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটানো এই ভাইদের ভাগ্য বদলে যায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। আব্দুর রহিম টিসু গোদাগাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তার ভাই মেহেদী হাসান সেক্রেটারি পদ পাওয়ার পর পুরো এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করেন।

 

সাবেক এমপির আত্মীয় পরিচয় ও আশীর্বাদ ব্যবহার করে ২০২১ সালের পৌর নির্বাচনে বিপুল অর্থ খরচ করে মনিরুল ইসলাম মনির গোদাগাড়ী পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাদের এই দাপটের সামনে স্থানীয় প্রশাসনও একপ্রকার জিম্মি ছিল।

 

 

​সাবেক এমপিকে ‘গাড়ি উপহার’ ও মাদক নেটওয়ার্ক ​অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় মাদক কারবারি আবদুর রহিম টিসু তার নামে কেনা একটি নতুন কালো রঙের মাইক্রোবাস (হাইস) তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীকে নির্বাচনী গণসংযোগের জন্য ‘উপহার’ দিয়েছিলেন। ২০২২ সালে এই নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হলে এমপি ফারুক চৌধুরী দাবি করেন, তার ছেলে গাড়িটি টিপুর কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন। তবে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, মাদক কারবার নির্বিঘ্ন রাখতে ও আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচতেই গাড়িটি উপহার দেওয়া হয়েছিল।

​সীমান্ত পেরিয়ে অস্ত্র ও হেরোইন ব্যবসা মামলার দীর্ঘ খতিয়ান
​স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে নদীপথে অবৈধ অস্ত্র ও হেরোইন এনে গোদাগাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি বর্ষণ ও হত্যার সঙ্গেও এই পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও রাষ্ট্রদ্রোহের একাধিক মামলা রয়েছে:
​১. মো: মনিরুল ইসলাম মনির (৪৮): মাদকের ‘টপ সম্রাট’ ও সাবেক কাউন্সিলর মনিরের নামে অসংখ্য মামলা রয়েছে। ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল পৌনে ৪ কেজি হেরোইনসহ চারঘাট থানা-পুলিশ এবং ২০১৭ সালে ৪ কেজি হেরোইনসহ পুঠিয়া থানা-পুলিশের (এফআইআর নং-২৭, তারিখ-২৮/০১/২০১৭) হাতে গ্রেফতার হন। এছাড়াও ২০২৫ সালে মারামারি ও বিস্ফোরক আইনে (মামলা নং ২৫আই/২৫) মামলা রয়েছে এবং বর্তমানে ২টি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তিনি পলাতক।
​২. মো: মেহেদী হাসান (৪৪): শীর্ষ মাদক কারবারী মেহেদীর বিরুদ্ধে ২০১২ সাল থেকে মাদকের মামলা (গোদাগাড়ী এফআইআর নং-২৩) রয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে। তিনিও বর্তমানে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি।
​৩. মো: আব্দুর রহিম টিসু / টিপু (৩৮): স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৭ সালে রাজশাহীর শীর্ষ ১৫ মাদক কারবারির তালিকায় টিপুর নাম ছিল। ২০১০ সাল থেকেই বোয়ালিয়া ও গোদাগাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মাদকের মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৭ মে ৪ কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় সর্বশেষ মামলা (নং-১৩) হয়। এছাড়া সম্প্রতি র‍্যাব-৫-এর অভিযানে দিয়াড় মানিকচক থেকে ৩ কেজি ৪০০ গ্রাম হেরোইনসহ সোলায়মান ও রুহুল আমিন নামের দুই মাদক কারবারি ধরা পড়লে, তারা স্বীকার করে এই হেরোইন টিপুর চাহিদামতো ভারত থেকে আনা হয়েছিল।
​৪. মো: সোহেল রানা (৩৮): শীর্ষ মাদক মাফিয়া ও ‘ব্যান্ডার বাহিনী’র মূল হোতা সোহেল রানার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে গোদাগাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একাধিক মামলা (এফআইআর নং-৩ ও ৭) দায়ের হয়েছে।

​জিরো থেকে হাজার কোটি টাকার পাহাড়
​লিখিত অভিযোগে এই পরিবারের অর্জিত সম্পদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। মাদকের কালো টাকায় অর্জিত অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে
​বিলাসবহুল বাড়ি ও ভবন মাদারপুরে সরকারি রেলের জায়গা দখল করে নির্মিত আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি ও দুটি একতলা বাড়ি। রাজশাহী মহানগরীর নিমতলায় ২৮ কোটি টাকা মূল্যের চারতলা ভবন এবং পদ্মা আবাসিক এলাকায় রাজকীয় তিনতলা ভবন (হোল্ডিং নং-৪১৯)।
​ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মহিষালবাড়ী বাজারে তমা ইলেকট্রনিক্স, আনুসকা ফ্যাশন, মুনিয়া গার্মেন্টস, একটি স্বর্ণের দোকান, রাজশাহী নিউ মার্কেটে ৩টি এবং সাহেব বাজারে আরও ৩টি বড় দোকান।
​ভূমি ও খামার ঘুমটি ও সাগুয়ান মোড়ে রেলের জমি দখল করে নির্মিত ১৬০ কোটি টাকার মার্কেট, ৯৬ বিঘা ধানী জমি, চরের ২১ বিঘা জমি এবং বিভিন্ন এলাকায় ২৭টি মাছের পুকুর। মাদারপুর ও হাবাসপুরে রয়েছে বিশাল গরু ও মুরগির খামার এছাড়াও নামে বেনামে আরো অনেক সম্পদ রয়েছে।
​যানবাহন মাছ পরিবহনের ট্রাক ছাড়াও দুটি বিলাসবহুল টয়োটা কার এবং দুটি হাইস মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ ২০-৬১১৩ এবং ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৩-৩৭৬৩)।

​প্রতিবাদ করলেই মাদক দিয়ে ফাঁসানোর নাটক
​এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো এই সিন্ডিকেটের মাদক দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
​আমার ভাইকে আর আমাকে দুই দুইবার মিথ্যা হেরোইন দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছে এই মনির কমিশনারের সিন্ডিকেট। আমাদের পুরো পরিবারটা এই মিথ্যা মামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিত নৌকা মার্কায় ভোট না দিলে এলাকায় থাকতে দেওয়া হবে না।
​অভিযোগকারী বলেন, আমরা চোখের সামনে তাদের রিকশা ও নৌকা চালাতে দেখেছি। কিন্তু হঠাৎ করে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া এবং এলাকায় অস্ত্রের ঝনঝনানি সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমরা এই দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
​প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের উদ্যোগ
​দেশজুড়ে মাদকের বিস্তার রোধে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত কঠোর ও জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ করেছে। চলমান বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে প্রশাসন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে
১. তালিকা হালনাগাদ: গোদাগাড়ীসহ চিহ্নিত মাদক সম্রাট ও গডফাদারদের একটি সমন্বিত নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো মাফিয়াদের নাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাখা হয়েছে।
২. যৌথ অভিযান: পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে সীমান্তবর্তী নদীপথগুলোতে কোস্ট গার্ড ও বিজিবির টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে।
৩. সম্পত্তি ক্রোকের আইনি প্রক্রিয়া: মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকার খোঁজে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যৌথ ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টিগেশন (আর্থিক অনুসন্ধান) শুরু করেছে। এই ভাইদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (স্থগিত) এবং সম্পত্তি ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

​এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সাথে জড়িত অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী বা যে দলেরই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ টিম কাজ করছে। খুব দ্রুতই তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। একই সাথে সরকারি ও রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখলমুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved  2019 CitizenNews24
Theme Developed BY ThemesBazar.Com