আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিচিত সমাজ বা গোষ্ঠী ‘বেদে সমাজ’। কিন্তু এই বেদে সমাজের জীবনযাপন সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না।
তাদের রয়েছে একটি ভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। অথচ সমাজে বেদেরা নিচু জাত হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। বেদে সমাজ মূলত নারী শাসিত। অর্থাৎ এ সমাজে সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় পরিবারের নারীদের দ্বারা। বেদে সমাজের নেই কোনো নির্দিষ্ট এলাকা। সময় সুযোগ বুঝে এরা বিভিন্ন এলাকায় গড়ে বসতি। বেদে নারীদের জীবন সংগ্রামের দিকে চোখ রাখলে পাওয়া যায় তাদের সংগ্রামের ইতিহাস।
নেত্রকোণার কাঞ্চনপুর থেকে শিশু মহুয়াকে চুরি করেছিল হুমরা বাইদ্যা। প্রেমিক নদের চাঁদকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্তে বিষলক্ষ্যা ছুরি দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল যুবতী মহুয়া। প্রায় পৌনে চারশো বছর আগে কানাইয়ের ‘মহুয়া পালার’ মূল গল্পে এই নারীকে কেন্দ্র করে বর্ণিত হয় বেদে জনগোষ্ঠীর জীবন।
জন্মগতভাবে না হলেও মহুয়া ছিল বেদেকন্যা।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের নাগিন কন্যার কাহিনিতে হিজল বিলের ‘বিষ বেদে’ সম্প্রদায়ের নারী অথবা আল মাহমুদের জলবেশ্যায় উঠে আসা চরিত্রগুলোই প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর নারী চরিত্রের প্রতীক।
সাহিত্যের সাথে যে বাস্তবের বিবস্তর ব্যবধান, তার প্রমাণ রাজধানীর পান্থপথের মোড়ের সিগন্যাল, বেইলি রোড বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হঠাৎ দেখা বেদে নারীদের বাস্তবতা। দশ হাত শাড়ির আড়াই প্যাঁচের ঢঙে জড়ানো, শরীরে থাকে অসংখ্য পুঁতির মালা। পায়ে মল বা নূপুর। দুই হাত ভর্তি চুড়ির সঙ্গে থাকে নাকে-কানে দৃশ্যমান গয়না। এসব আমাদের চোখ টেনে রাখে। কিন্তু তাদের হাতে থাকা ছোট কাঠের বাক্সটি দেখামাত্রই চোখ বন্ধ করে রাখতে ইচ্ছে করে। ওর মধ্যে সাপ না থাকলেও আমাদের জন্য থাকে ভয়। অদেখা যে কোনো কিছুতেই এ ভয় মানুষের মজ্জাগত। সেটাই কাজে লাগিয়ে উপার্জন করে তারা।
সত্যি বলতে এদিকে তাদের ঠেলে দিয়েছি আমরাই। বেদে সমাজ যা জানত, যা তাদের আয়ের পথ, তা হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। বেদে জনগোষ্ঠীতে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি কর্মঠ।
সেই ভোরবেলা গাওয়াল করতে বের হয়। ফিরে বিকেলে। পায়ে পায়ে বাড়ি খায় পেটিকোটের ফুল দেওয়া কুঁচি। কিন্তু এই নারীদের স্বাস্থ্য বেদনাহত হওয়ার মতো উপেক্ষিত।
অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৪-১৫ বছরের মধ্যে। ফরিদপুরের মুন্সিবাজারের পথের পাশে একজনের ফেলে রাখা জমিতে আছে ১৮ ঘরের বেদেপল্লী। হলুদ শাড়ি পরে মাঠের মধ্যে বসেছিলেন সন্তানসম্ভবা কোহিনুর। জানতে চেয়েছিলাম ঝড় এলে কোথায় থাকবেন। হাতে থাকা গাছের এক শুকনা ডাল উঁচু করে এমন এমন ভঙ্গিমায় দেখালেন, যেন প্রাসাদের সুরক্ষিত নিরাপত্তা। অথচ ওটা বাঁশের দুটি টানা দিয়ে টাঙানো একটি কালো প্লাস্টিকের ছাউনি। মাটির ওপর একটা ছেঁড়া পাটি পেতে ঘুমানোর ব্যবস্থা। মাত্র ২১ বছর বয়সি শাবনুরের তিনটি সন্তান আছে, এরই মধ্যে। চতুর্থ সন্তান জন্মের সময় এমন অপুষ্টিতে ভুগছেন যে নিজেরই টিকে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে এখন।
বেদে সম্প্রদায়ের নারীরা সন্তান জন্মের জন্য সাধারণত সদর হাসপাতালেও যায় না। তাদের অভিযোগ নার্স বা চিকিৎসকদের অবহেলা নিয়ে। নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই আছেন কয়েকজন ধাই।
তাদের একজন যেমন সদরপুরের তসলিমা বেগম। তিনি বলছিলেন, ‘ওপরে আল্লাহ আর নিচে আমি।
আমার হাতে যতক্ষণ রোগী আছে, জান থাকা পর্যন্ত আইম ছাড়বো না।’ তসলিমা খাতুনের হাতে জন্ম নিয়েছে কয়েকশ শিশু। তিনি এ বিদ্যা শিখেছেন তার শাশুড়ি আর দাদি শাশুড়ির কাজ দেখে দেখে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, ‘নরমাল ডেলিভারির সময় যে নিয়মকানুনগুলো মানতে হয়, বেদে জনগোষ্ঠীর নারীদের সেটুকু প্রশিক্ষণও নেই। যেহেতু এ মানুষদের জন্য আমরা সমাজের সব ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ অবারিত রাখিনি, তাই মাঝে মধ্যে মেডিকেল ক্যাম্প করে হলেও মৌলিক কিছু বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। কিশোরীদের মাসিকের সময়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও কোনো সাধারণ ধারণা নেই। এই অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা শুধু নারীর নিজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা-ই নয়। একই সঙ্গে তার সন্তানের সুস্থতা নিয়েও আশঙ্কা থাকে।’
এদিকে মুন্সিগঞ্জের গোয়ালীমান্দা হচ্ছে এ অঞ্চলের বেদে সম্প্রদায়ের আদি নিবাস। এখানে এখন বসবাস করেন কয়েক হাজার মানুষ। যারা নৌকা ছেড়ে স্থলভাগে বাস করছেন বহুদিন হলো। অনেকের জীবিকায় এসেছে পরিবর্তন। নারীরা শিঙা ফুকা বা বিষ ব্যথা নামানোর পেশা বাদ দিয়েছেন। মেয়ে শিশুরা যাচ্ছে স্কুল-মাদ্রাসায়। তবে স্বাস্থ্য বিষয়ে অসচেতনতা একই রকম। পোষাকে ও সাজে তারা অনিন্দ্য অথচ স্বাস্থ্য বিষয়ে অজ্ঞ। মারা যাওয়া একটি গরুর পাশে বসেই চার নারী বসে গল্প করছেন। উঠানের এখানে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধা, মাছি ঘুরছে ভন ভন করে। সেই পরিবেশে বসে শিশুদের থালায় ভাত মেখে দিচ্ছেন দু’জন। তাদের কোমরে রুপার বিছা আর হাতের বাজু বন্ধনী চমকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সুন্দর মুখে, শরীরের ত্বকে নানা রকম ছত্রাকের বাসা।
প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীর প্রতি নানা কারণে আমাদের আকর্ষণ আছে, কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সচেতন হওয়ার দায়িত্বটা উপেক্ষা করা চলে না। সরকারি হাসপাতালে গেলে যেন চিকিৎসার মৌলিক অধিকারটুকু পায়, সে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বছরে অন্তত দু’বার করে মেডিকেল ক্যাম্প করার প্রয়োজন এই বেদে পল্লিগুলোতে।
একটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেলে সারা দেশের সুরক্ষা সম্ভব নয় কখনোই।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 























