বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের পানির উৎস হিসেবে নির্ধারিত ঐতিহ্যবাহী পচা দিঘিকে ভবিষ্যতে সুপেয় পানি সরবরাহের কাজে কার্যকরভাবে ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে জেলা প্রশাসন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ভৈরব নদ থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণ এবং পরে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষা মূলক ভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও পরবর্তীতে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অব কাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কয়েকটি যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। কিছু সরঞ্জাম চুরি যাওয়ার কথাও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা গেলে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটি পুনরায় কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
এদিকে, প্রকল্পের পানির উৎস হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনায় থাকা পচা দিঘিটি বর্তমানে মাছ চাষ ও মাছ শিকারের জন্য ইজারা দেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দিন ধরে সেখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সৌখিন মাছ শিকারিরা অংশ নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিঘিটির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মনেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাছ শিকারের সময় বিভিন্ন ধরনের টোপ ও উপকরণ ব্যবহারের কারণে দিঘির পানির গুণাগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাছ ধরার আয়োজনের পর পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন বর্জ্য জমে থাকার বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সরেজমিনে দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, সিগারেটের প্যাকেট ও ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান বলেন, দিঘির পানি আশপাশের মানুষ রান্না, গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। পানি সরবরাহ প্রকল্পটি কার্যকরভাবে চালু হলে এই পানির উৎসকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিশোধনের মাধ্যমে পৌরবাসীর উপকারে লাগানো সম্ভব।
আরেক বাসিন্দা শিমুল বলেন, দিঘির পানি পরিশোধন করে পৌর এলাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে পানির সংকট অনেকটাই কমে আসতে পারে। এজন্য দিঘিটির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বাসস’কে বলেন, বাগেরহাটের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে পচা দিঘির পানিকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থেকেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রকল্পটি পুনরায় কার্যকর করার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এখানকার পানি ট্রিটমেন্ট করে দেয়া যায় কি-না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদি লিজের আওতায় রয়েছে, তাই লিজের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে পুকুরটিকে বিশেষ করে খাবার পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যায় কি-না, সেটিও আমরা দেখব।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি পুনরায় চালু করতে কারিগরি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানির উৎস সংরক্ষণ-এই তিনটি বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি দিঘির পানি যাতে দূষিত না হয়, সে জন্য পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রকল্পটি পুনরায় চালু হবে। এতে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বাগেরহাট পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে একটি টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 






















