মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ১২:৩১ অপরাহ্ন
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ::
সিটিজেন নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। যারা আগ্রহী আমাদের ই-মেইলে সিভি পাঠান

পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধক প্লাস্টিক বর্জ্য: দয়াল কুমার বড়ুয়া

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
  • ৭৪ বার পঠিত

প্লাস্টিক এখন পরিবেশ দূষণ নামের দুঃস্বপ্নের শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অপব্যবহার এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে বিশ্বব্যাপী বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্লাস্টিকের জীবনচক্রের প্রথম ধাপ শুরু হয়ে জীবাশ্ম জালানি, অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস নিষ্কাশনের মধ্য দিয়ে। এই অনবায়নযোগ্য শক্তি উৎসগুলোকে প্লাস্টিক উৎপাদনের কাঁচামাল, যেমন– ইথিলিন ও প্রোপিলিন পেতে ব্যবহার করা হয়। এই নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার ফলে বায়ু ও পানি দূষণ হয় এবং এর ফলে নির্গত গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড়সড় ঘটনা ঘটে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রেনমেন্টাল ল বা আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৯৯ শতাংশ প্লাস্টিকই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। শুধু ২০২০ সালেই বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক শিল্প থেকে ১.৮ বিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্যাস বের হয়েছে, যা কি না ৩৮০টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ও প্যাকেটজাতকরণের সমান।
প্লাস্টিক প্যাকেজিং প্লাস্টিক ব্যবহারের অন্যতম ক্ষেত্র এবং বছরের পর বছর ধরে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এলেন ম্যাক আর্থার ফাউন্ডেশনের মতে, শুধু প্লাস্টিক প্যাকেটের উৎপাদনেই ২০২০ সালে ১৪৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্রয়োজন হয়েছে। এই পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় প্রায় ২৮ শতাংশ।
প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের বিস্তৃত ব্যবহারের মধ্যে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী উপকরণ, সবই পরিবেশ ক্ষয়ের অন্যতম অবদান রাখে। এসইউপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার এখন সর্বব্যাপী, বিশেষ করে একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যাগ, স্ট্র এবং বোতলের মতো দ্রব্যাদি।
মূল সমস্যাটা হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে। একটি বড় পরিমাণের প্লাস্টিক বর্জ্য গিয়ে জমা হয় ভাগাড়ে, যেগুলো পচতে সময় গেলে যায় বছরের পর বছর। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে একটি মোটামুটি পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্যের গন্তব্য হয় জলাশয়গুলো, যার জের ধরেই ক্রমবর্ধমান সমুদ্র দূষণের সমস্যাটি আরও বৃদ্ধি পায়।
সমুদ্র যেন প্লাস্টিক বর্জ্যের এক বিশাল মজুদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এতে করে বিপর্যস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীবন। জাতিসংঘের পরিবেশ প্রোগ্রামের (ইউএনইপি) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ৮ মিলিয়নেরও বেশি মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতি বছর সমুদ্রে প্রবেশ করে। এই প্লাস্টিক দূষণ সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য বিশাল হুমকির রূপ নেয়, কেন না তারা প্রায়ই ভুল করে প্লাস্টিককে খাবার মনে করে বা বিভিন্নভাবে তাদের শরীর প্লাস্টিকের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
প্লাস্টিক বর্জ্যের ফলে মাটি দূষিত হয় এবং এতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে জীবজগত ও উদ্ভিদকূল উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাটির উর্বরতা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতা বিঘ্নিত হয়।
প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার ফলে পরিবেশে বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ মিশে যায়, যার ফলে বায়ু দূষণ ঘটে এবং পরবর্তীতে শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত রোগব্যাধির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে ভয়ের দিকটি হচ্ছে এর দীর্ঘস্থায়িতা। প্লাস্টিকের পচনে বহু বহু বছর কেটে যায় এবং বহু বছর পরও এটি ভেঙে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক নামের ক্ষুদ্রাংশে পরিণত হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের আকার ৫ মিলিমিটারের চেয়েও কম এবং সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে যে বাতাসে আমরা শ্বাস নিই– তার সবখানেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এই ছোট ছোট কণাগুলো খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্ম দেয়।
প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ও খালে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অনিবার্য করে তুলছে জলাবদ্ধতা। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব বর্জ্যরে অধিকাংশ রাস্তা, ড্রেন, খালসহ জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। যেগুলো ড্রেনে আটকে বৃষ্টির পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তুলে জলাবদ্ধতার অভিশাপ নিশ্চিত করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি। ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এর ব্যবহার ৩ গুণের বেশি বেড়েছে। ঢাকায় একবার ব্যবহারের পর এর ৮০ শতাংশ মাটিতে ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে নালা ও খাল হয়ে নদীতে পড়ে সর্বশেষ ঠাঁই হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। নদী হয়ে সাগরে যাওয়া প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন ষষ্ঠ স্থানে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে অবচেতন মনে অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গে ফেলা হচ্ছে। ১০০-এর বেশি ফ্যাক্টরিতে এসব পলিথিন ব্যাগ তৈরি হয়। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে দেশে আইন হয়েছে দুই দশকের বেশি আগে। কিন্তু আইন প্রয়োগের অভাবে তা কোনো সুফল বয়ে আনছে না। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও উৎকোচের বদৌলতে থেমে
নেই উৎপাদন। সারা দেশে এর ব্যবহার অতিমাত্রায় পৌঁছেছে। এরকম একটি অপচনশীল পণ্য খাল, নদীসহ সব জলাশয়ে ফেলায় সেগুলো ক্রমাগতভাবে ভরাট হচ্ছে। তা থামানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের নাকের ডগায় পুরান ঢাকায় নির্বিচারে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের আগ্রাসন ঠেকাতে আইন প্রয়োগকারীদের সুমতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যাদের যোগসাজশে পলিথিন কারখানাগুলো টিকে আছে তাদের উৎকোচে বাধা সৃষ্টি করতে হবে। নইলে আইন কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে। জাতির সঙ্গে শত্রুতায় লিপ্ত পলিথিন ব্যবসায়ীদের কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।

 

দয়াল কুমার বড়ুয়া, কলামিস্ট ও জাতীয় পার্টি নেতা, সভাপতি, চবি অ্যালামনাই বসুন্ধরা। সংসদ সদস্য প্রার্থী ঢাকা-১৮ আসন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved  2019 CitizenNews24
Theme Developed BY ThemesBazar.Com