পিরোজপুর প্রতিনিধি:
পিরোজপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীন যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কৃষি প্রশিক্ষণ প্রকল্পে উপস্থিতি জালিয়াতি, ভুয়া আবাসিক দেখানো এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
পিরোজপুর জেলার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিচালিত কৃষি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের ১৩০তম ব্যাচে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায় যে, উক্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপস্থিতি জালিয়াতি, আবাসিক সুবিধা ভোগ না করেও ভুয়া উপস্থিতি দেখানো এবং খাদ্য বাবদ সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের নানা অভিযোগ রয়েছে।
পিরোজপুর যুব উন্নয়নে সরজমিনে গিয়ে গবাদি প্রাণি, হাঁস-মুরগি পালন, প্রাথমিক চিকিৎসা, মৎস্য চাষ ও কৃষি” বিষয়ক প্রকল্পের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ১৩০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের থেকে জানা যায়, তিন মাস ব্যাপী প্রকল্পে ৫৫ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসরুমে এবং আবাসিকে ১৫ থেকে থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী এভারেজ উপস্থিত থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল কিন্তু প্রশিক্ষকেরা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্ট দেখিয়ে মাথাপিছু ১৫০ টাকা নিজের ভেতরে ভাগাভাগি করে নেয়।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে আরো জানান, আবাসিকে রমজান মাসে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ রমজানের সুবিধা ভোগ করেনি এর পরেও কর্তৃপক্ষ সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত দেখিয়ে ফাইনাল অ্যাটেনডেন্স শিট তৈরি করেছে। ক্লাসরুমে অধিকাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলেও একজন শিক্ষার্থী মাঝেমধ্যে এসে একাধিক দিনের অ্যাটেন্ডেন্স শিটে সিগনেচার করার অভিযোগও করেন তারা। এছাড়াও ভর্তির সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের সুপারিশের মাধ্যমে এবং স্বজন প্রীতি দেখানো হয়েছে বলে জানায় প্রশিক্ষণার্থীরা।
নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতির সংখ্যা গড়ে ২৫-৩০ মাঝেমধ্যে এবং গড় হিসাবে ২০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কখনো কখনো উপস্থিতির সংখ্যা ১৮-২০ জনেও নেমে আসে। যেসব প্রশিক্ষণার্থীর নামে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে, তাদের অধিকাংশই আবাসিক সুবিধা গ্রহণ করেনি এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অবস্থান করেনি। ডাইনিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রতিদিন উপস্থিত প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ১৮-৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ৫৫ জনের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য ব্যয়ের হিসাব উত্তোলন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পূর্বে ক্লাসে অংশগ্রহণ না করা প্রশিক্ষণার্থীদেরও প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর সনদপত্র (Certificate) প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও সরকারি কোন বরাদ্দ এবং নির্দেশনা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে ব্যাগ এবং গেঞ্জি। যদি বরাদ্দ না থাকে এবং সরকারি নির্দেশনা না থাকে তাহলে ব্যাগ এবং গেঞ্জির খরচ কিভাবে তারা বহন করে প্রশ্ন সাধারন শিক্ষার্থীদের। তবে এই উদারতা দেখে মনে হয় বড় দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকতে শিক্ষার্থীদের ছোট উপহার।
১৩০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাঈম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমরা ১৩০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি ব্যাচ গঠন করা হয়। যেখানে ভর্তি হয়েছে ৫৫ জন। রেগুলার ক্লাসে উপস্থিত ছিল ২৫ থেকে ৩০ জন। বাকিরা অনুপস্থিত থাকতেও তাদেরও প্রেজেন্টেশন হয়েছে। যাদের প্রেজেন্টেশন নেয়া হয়েছে কেউ কেউ আবাসিকে ছিল আবার কেউ কেউ ছিল না। আবাসিকে থাকার জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়। অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী আবাসিকে থাকলেও অধিকাংশের আবাসিকে থাকার প্রেজেন্টেশন এবং বরাদ্দ উঠানো হয়েছে। আমরা যারা কষ্ট করে ক্লাস করেছি তাদের কথা হচ্ছে এটাই, স্যাররা তাহলে তো দুর্নীতি করলো। যারা ক্লাস করে নাই তাদের সার্টিফিকেট দিল, তাদের হাজিরা উঠাইলো, তাদের টাকাটা নিজেরা খাইলো। এটাতো এক প্রকার দুর্নীতি। আমাদের দাবি হচ্ছে এখানে সুষ্ঠু একটা তদন্ত হোক। ৫৫ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৮ জন উপস্থিত থাকলেও সবার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ফাইনাল এক্সামে ভিডিও ক্লিপে দেখবেন ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত নেই কিন্তু সবার থেকেই বাজেট উঠানো হয়েছে। এর একটা সুস্থ তদন্ত হোক। সরকারের ব্যয় সঠিক খাতে হোক।
একই ব্যাচের অন্য এক শিক্ষার্থী ক্লাস ক্যাপ্টেন সিরাজ বলেন, আমি ছেলেদের ভিতর ক্যাপ্টেন। আমরা সবাই একত্রিত হয়েছি। আমার কাছে সবাই অভিযোগ দিয়েছে যেহেতু আমি ক্যাপ্টেন। স্যাররা ৫৫ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি নিয়েছে। আমরা এখানে রেগুলার ক্লাস করেছি ২০-২৫ জন এবং ১২-১৩ জন। গড়ে মিলাইয়া ১৭-১৮ জন হবে। আমরা বাড়ি থেকে অনেক কষ্ট করে এসে ক্লাস করেছি। এই কোর্সটি আবাসিক হওয়ার পরেও অনেকেই এই সুবিধা ভোগ করে নাই। ৫৫ জন শিক্ষার্থীদের সবাইকেই প্রেজেন্ট দেখানো হয়েছে। এটার একটি সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারক হোক। যারা ক্লাস করে নাই তারাও কেন প্রেজেন্ট পাবে! কিছু লোক আবার সারা মাস ক্লাস করে নাই পরীক্ষার সময় আইয়া এক্সাম দিছে। আর আমরা তিন মাস কষ্ট করে ক্লাস করেছি, আমাদের যা মূল্যায়ন তাদেরও একই মূল্যায়ন। এগুলো সব মিলিয়ে একটি সুষ্ঠু তদন্ত হোক। যারা রেগুলার আসে নাই তারা এক দিন এসে বাকি দিনের প্রেজেন্ট দিয়ে গেছে এবং চূড়ান্তভাবে শীট তৈরি করছে। চূড়ান্ত শিট কিভাবে তৈরি করল, তারা তো ক্লাসে আসে নাই এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক।
এ বিষয়ে জাগো নিউজ ২৯ মার্চ পিরোজপুর যুব উন্নয়নে গবাদি প্রাণি, হাঁস-মুরগি পালন প্রশিক্ষণ বিষয়ে পিরোজপুর যুব উন্নয়নের ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর আমিরুল ইসলামের কাছে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জানতে গেলে তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষক(পশুপালন) এইচ. এম. আহসান আকীব সুজন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর ছুটিতে রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে গবাদি প্রাণি, হাঁস-মুরগি পালন প্রকল্পের প্রশিক্ষক(পশুপালন) এইচ. এম. আহসান আকীব সুজন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং শিক্ষার্থীদের হাতে কোন টাকা দেয়া হয় না। মাথাপিছু ১৫০ টাকা আবাসিক ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ মিটানো হয়। এখানকার প্রশিক্ষণার্থীরা আবাসিক সুবিধা নিয়ে থাকে। এছাড়াও তিনি বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গেঞ্জি এবং ব্যাগ দেয়া হচ্ছে প্রচারণার জন্য। এ বিষয়ে সরকারি বরাদ্দ আছে কিনা এবং কিভাবে ব্যয় করা হয় জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন, সরকারি কোনো নির্দেশনা এবং বরাদ্দ নেই। তবে কিছু শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে তাদের মাথাপিছু ১৫০ টাকা মাস শেষ হলে হিসাব করে এগুলো প্রচারণার জন্য ব্যয় করতে হয়, যাতে শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বিস্তারিত ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর বলতে পারবেন।
যুব উন্নয়ন থেকে চলে আসার সময় ১৩০ তম ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী ও অভিযোগকারী ক্লাস ক্যাপ্টেন সিরাজ সাংবাদিকদের উক্ত প্রশিক্ষণের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে একান্তে আলোচনা করতে বলেন এবং আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব দেয়। সাংবাদিকরা বিষয়টা বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক স্থান ত্যাগ করে।
৩১ মার্চ সকাল ১১টার দিকে পিরোজপুর যুব উন্নয়নের ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর আমিরুল ইসলামের কাছে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা জানতে চাইলে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি এবং উক্ত প্রশিক্ষণের অন্যান্য কর্মচারীরা সাংবাদিকদের উপরে চড়াও হয়ে লাঞ্চিত করেন। অনেকক্ষণ সাংবাদিকদের আক্রমণাত্মক কথা বলার পরে অফিস থেকে বের হয়ে যেতে বলেন এবং প্রশিক্ষক মোস্তফা আক্রমনাত্মক ভাবে বলেন, তথ্য চাইলেই কি তথ্য পাওয়া যায়, কোন তথ্য দেয়া যাবে না। আপনারা কিসের সাংবাদিক? আপনারা কি প্রেসক্লাবের সদস্য? আপনারা প্রেসক্লাবের সদস্য না হলে আপনারা কোন সাংবাদিকই না। প্রশিক্ষক আকিব এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের উপরে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং যুব উন্নয়নে আসতে নিষেধ করে। পরিশেষে পিরোজপুর ৭১ টেলিভিশন, জাগো নিউজ এবং বাংলাদেশ টাইমসের প্রতিনিধি নিরুপায় হয়ে কোন তথ্য এবং কো-অর্ডিনেটর এর বক্তব্য ছাড়াই চলে আসতে বাধ্য হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং দুর্নীতির বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক(প্রশিক্ষণ)প্রিয় সিন্ধু তালুকদার কে বিষয়টি জানালে তিনি মুঠোফোনে বলেন, এই প্রশিক্ষণে কোন ব্যাগ বা গেঞ্জি দেওয়ার নির্দেশনা এবং বরাদ্দ নেই। তারপরেও পিরোজপুর যুব উন্নয়নের গবাদি পশু ও হাঁস মুরগি পালন প্রশিক্ষণের সংশ্লিষ্টরা কিভাবে এই ব্যয় মিটিয়ে থাকেন তা দ্রুত তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি এখনও মনে করি এ বিষয়টি জরুরী তদন্ত করা প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। সাংবাদিকদের সাথে এরকম আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান মুঠো ফোনে বলেন, আমাদের কাছে কোন কমপ্লেইন আসলে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তদন্ত করব। কেউ যদি দোষী হয় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। আমরা স্বচ্ছ ভাবে কাজ করতে চাই এবং দেশের জন্য কাজ করতে চাই। আমাকে তথ্য পাঠান আমি আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
পিরোজপুর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কৃষি প্রকল্পে সংঘটিত অনিয়মসমূহ প্রাথমিকভাবে গুরুতর দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে। উপস্থিতি জালিয়াতি, ভুয়া আবাসিক দেখানো এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি।