ঢাকা ০৭:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিয়াকৈরে বোয়ালীতে পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন এডভোকেট আতিকুর রহমান ‘দেশের মাটিতে খেলা, নিজেদের সেরাটা দিয়ে সম্মান ধরে রাখতে চাই’ : সানজিদা মানিকগঞ্জে ১২ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন খাদ্যমন্ত্রী নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যা ও দোয়ারাবাজারে এম এ মোতালিবের উপর হামলার প্রতিবাদে তাহিরপুরে মানববন্ধন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার সমান : প্রধানমন্ত্রী নেএকোণায় সাংবাদিক আলিফ হ/ত্যার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার মানববন্ধন বাণিজ্য কূটনীতির লক্ষ্য নিয়ে ভারতে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও টোকিওতে ২৭ অক্টোবর তারেক-তাকাইচি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক রাজশাহীতে আখচাষীদের ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি

হকার সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি ? নাকি হকার উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে নতুন সিন্ডিকেটের হাতবদল

মঈনউদ্দিন মনি, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ফুটপাত বা ওভারপাসে দোকান বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা বেআইনি। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদে হাঁটার অধিকার নিশ্চিত করতে ফুটপাত হকারমুক্ত করা জরুরি। ব্যস্ত মোড় বা রাস্তার একাংশ দখল করে হকাররা বসার কারণে শহরের যানজট ও বিশৃঙ্খলা বাড়ে। নগরীর শৃঙ্খলা ফেরাতে এটি আংশিক যৌক্তিক। অধিকাংশ হকারই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বাস্তু বা চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশ। বিকল্প কোনো ভেন্ডিং জোন বা ব্যবসার নির্দিষ্ট জায়গা না দিলে পেটের তাগিদে তারা আবারও রাস্তায় ফিরতে বাধ্য হয়।স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, কিছু অসাধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মকর্তা মিলে হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলে। উচ্ছেদ অভিযানে কেবল হকারদের শাস্তি হয়, কিন্তু এই মূল সিন্ডিকেটটি আড়ালেই থেকে যায়। ফলে প্রশাসন চলে গেলেই সিন্ডিকেটের মদদে দোকানগুলো আবার বসে。সাধারণ ও স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য ফুটপাতের সস্তা পণ্য একটি বড় ভরসা। যেখানে ক্রেতার সমাগম বেশি, হকাররা সেখানেই বসার চেষ্টা করে। জনশূন্য বা প্রত্যন্ত কোনো এলাকায় তাদের সরিয়ে দিলে ব্যবসা চলে না।

নিয়মতান্ত্রিক পুনর্বাসন ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া সারাদেশে ঢালাও হকার উচ্ছেদ দীর্ঘমেয়াদে সফল বা বলবৎ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। পথচারীদের অবাধ চলাচল এবং যানজট নিরসনে ফুটপাত দখলমুক্ত করার একটি আইনি ও জনকল্যাণমুখী যৌক্তিকতা থাকলেও, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসন ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ করা হলে তা তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়া মাত্রই কয়েকদিনের মধ্যে হকাররা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসে এবং এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া একটি চক্রাকার ব্যর্থতায় রূপ নেয়।
উচ্ছেদকে স্থায়ী রূপ দিতে এবং হকারদের জীবিকা বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রকৃত হকারদের তালিকা তৈরি করে ডিজিটাল আইডি কার্ড বা নিবন্ধন দেওয়া। নির্দিষ্ট কিছু সড়ক চিহ্নিত করে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন বিকেল বা ছুটির দিনে) হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া। হকারদের উচ্ছেদের চেয়ে ফুটপাত দখল করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটগুলোকে স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া।
হকারদের জীবিকা রক্ষার অধিকার এবং পথচারীদের হাঁটার অধিকার—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি সমন্বিত ও মানবিক নীতিমালা তৈরি না করা পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো অতীতেও সফল হয়নি এবং ভবিষ্যতেও বলবৎ থাকবে না।
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবেই স্থানীয় ফুটপাত, হাটবাজার, খেয়াঘাট বা সরকারি জমি দখলের পেছনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক চক্র কাজ করে। সরকার পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী দলের সুবিধাভোগী বা চাঁদাবাজরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে সাময়িকভাবে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। প্রশাসন তখন উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বাহ্যিক একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক শক্তি বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা যখন মাঠ গোছাতে শুরু করে, তখন অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো চক্রের জায়গায় নতুন কোনো গ্রুপ এসে একই ধরণের দখল বা চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। দখলদার যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ফুটপাতে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে নিবন্ধিত হকারদের জন্য পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উচ্ছেদের নামে শুধু “মুখবদল” বা “লুটেরা পরিবর্তন” কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কালিয়াকৈরে বোয়ালীতে পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেন এডভোকেট আতিকুর রহমান

হকার সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি ? নাকি হকার উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে নতুন সিন্ডিকেটের হাতবদল

আপডেট টাইম : ০২:৫১:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মঈনউদ্দিন মনি, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ফুটপাত বা ওভারপাসে দোকান বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা বেআইনি। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদে হাঁটার অধিকার নিশ্চিত করতে ফুটপাত হকারমুক্ত করা জরুরি। ব্যস্ত মোড় বা রাস্তার একাংশ দখল করে হকাররা বসার কারণে শহরের যানজট ও বিশৃঙ্খলা বাড়ে। নগরীর শৃঙ্খলা ফেরাতে এটি আংশিক যৌক্তিক। অধিকাংশ হকারই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বাস্তু বা চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশ। বিকল্প কোনো ভেন্ডিং জোন বা ব্যবসার নির্দিষ্ট জায়গা না দিলে পেটের তাগিদে তারা আবারও রাস্তায় ফিরতে বাধ্য হয়।স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, কিছু অসাধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মকর্তা মিলে হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলে। উচ্ছেদ অভিযানে কেবল হকারদের শাস্তি হয়, কিন্তু এই মূল সিন্ডিকেটটি আড়ালেই থেকে যায়। ফলে প্রশাসন চলে গেলেই সিন্ডিকেটের মদদে দোকানগুলো আবার বসে。সাধারণ ও স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য ফুটপাতের সস্তা পণ্য একটি বড় ভরসা। যেখানে ক্রেতার সমাগম বেশি, হকাররা সেখানেই বসার চেষ্টা করে। জনশূন্য বা প্রত্যন্ত কোনো এলাকায় তাদের সরিয়ে দিলে ব্যবসা চলে না।

নিয়মতান্ত্রিক পুনর্বাসন ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া সারাদেশে ঢালাও হকার উচ্ছেদ দীর্ঘমেয়াদে সফল বা বলবৎ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। পথচারীদের অবাধ চলাচল এবং যানজট নিরসনে ফুটপাত দখলমুক্ত করার একটি আইনি ও জনকল্যাণমুখী যৌক্তিকতা থাকলেও, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসন ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ করা হলে তা তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়া মাত্রই কয়েকদিনের মধ্যে হকাররা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসে এবং এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া একটি চক্রাকার ব্যর্থতায় রূপ নেয়।
উচ্ছেদকে স্থায়ী রূপ দিতে এবং হকারদের জীবিকা বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রকৃত হকারদের তালিকা তৈরি করে ডিজিটাল আইডি কার্ড বা নিবন্ধন দেওয়া। নির্দিষ্ট কিছু সড়ক চিহ্নিত করে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন বিকেল বা ছুটির দিনে) হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া। হকারদের উচ্ছেদের চেয়ে ফুটপাত দখল করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটগুলোকে স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া।
হকারদের জীবিকা রক্ষার অধিকার এবং পথচারীদের হাঁটার অধিকার—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি সমন্বিত ও মানবিক নীতিমালা তৈরি না করা পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো অতীতেও সফল হয়নি এবং ভবিষ্যতেও বলবৎ থাকবে না।
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবেই স্থানীয় ফুটপাত, হাটবাজার, খেয়াঘাট বা সরকারি জমি দখলের পেছনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক চক্র কাজ করে। সরকার পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী দলের সুবিধাভোগী বা চাঁদাবাজরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে সাময়িকভাবে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। প্রশাসন তখন উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বাহ্যিক একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক শক্তি বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা যখন মাঠ গোছাতে শুরু করে, তখন অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো চক্রের জায়গায় নতুন কোনো গ্রুপ এসে একই ধরণের দখল বা চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। দখলদার যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ফুটপাতে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে নিবন্ধিত হকারদের জন্য পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উচ্ছেদের নামে শুধু “মুখবদল” বা “লুটেরা পরিবর্তন” কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।


প্রিন্ট