ঢাকা ০৯:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‎বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি ঐতিহ্যবাহী উপহার দেন খুলনা আর্ট একাডেমির সংগ্রহশালায় নীল শাড়িতে রাজকীয় সাজে নজর কাড়লেন কৌশানি যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তি—উন্নয়নের মূল শর্ত ঢাবি উপাচার্যের সঙ্গে জার্মান রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ঢাবির ১০৮ নবীন শিক্ষককে নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা নরসিংদীর শিবপুরে ৩ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বি আইডব্লিউটিএ ও ব্যবসায়ীদের দ্বন্ধ অবসানে প্রশাসনের সভা নারী অধিকারকর্মী, সংস্থা ও এআই গবেষকের অল্টারনেটিভ নোবেল জয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করল বিএফআইইউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে ব্যবসার সুযোগ দিতে হবে: জামায়াত আমির

প্রবীণ নাগরিক ফোরাম, চট্টগ্রাম প্রবীণদের ভালো থাকার অনন্য ঠিকানা

পৃথিবীর চিরন্তন নিয়মে মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু কমে না জীবনের প্রয়োজন। বরং কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর অনেকের প্রয়োজন হয় একটু বেশিই সঙ্গ, একটু বেশি মমতা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও নিজের কথা বলার মতো একটি জায়গা। অথচ পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের জন্য এমন নিরাপদ, আনন্দময় ও আপন একটি পরিসর সব সময় তৈরি হয় না।

সেই বাস্তবতা থেকে চট্টগ্রামে কয়েকজন প্রবীণ নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট উদ্যোগ। আজ সেটিই হয়ে উঠেছে প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভালো থাকার নানা আয়োজনের অনন্য ঠিকানা—‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম, চট্টগ্রাম’।

আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়—‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা বাড়ার এই সময়ে প্রবীণদের জীবনকে কিভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দময় করা যায়, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে এবারের দিবসে।

চট্টগ্রামে প্রবীণ নাগরিক ফোরামের কর্মকাণ্ডও যেন সেই ভাবনারই স্থানীয় এক বাস্তব প্রয়াস।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী থেকে অবসর নেওয়া, প্রকৃতি বিষয়ক লেখক-সম্পাদক ও কবি মুশফিক হোসাইন সংগঠনটির স্বপ্নদ্রষ্টা।

তিনি একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের একাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়ে ও হোয়াটস অ্যাপে একটি গ্রুপ খুলে ‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম’ গড়ে তোলার কথা ঘোষণা দেন।

তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রবীণ একটি ক্যাফেতে বৈঠকে মিলিত হন।

সেখান থেকেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু, সেদিন ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি।

মুশফিক হোসাইন বর্তমানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বাসস-কে বলেন, ‘একটা বিষয় খেয়াল করে দেখলাম, শহরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, তারা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় শরীরচর্চা বা কোনো ক্যাফেতে মাঝে মাঝে বসে আড্ডা জমান। এই বয়সটাতে হাসি-খুশি থাকা গেলে সুস্থ থাকা যায়। তাই এই সংগঠন করার উদ্যোগ।

প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলেন— আমিনুর রশিদ কাদেরী, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল বাকী, প্রফেসর ড. রণজিৎ কুমার চৌধুরী, আব্দুল মোমেন, সত্যজিৎ মজুমদার, প্রফেসর মুজিবুল হক চৌধুরী ও সাংবাদিক স ম ইবরাহিমসহ মোট ১২ জন।’

তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে সদস্যরা মাসে এক থেকে দুবার বৈঠকে মিলিত হতেন। প্রায় দুই বছর ধরে সেই বৈঠকের অন্যতম স্থান ছিল একটি ক্যাফে। কোনো বড় অবকাঠামো, বড় আয়োজন কিংবা আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে নয়— পারস্পরিক ভালোবাসা, মমত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধকে ভিত্তি করেই এগোতে থাকে ফোরাম। বর্তমানে আমাদের সদস্য সংখ্যা ১০১ জন। সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন পদের কর্মকর্তা।

মুশফিক হোসাইন জানান, যাত্রার প্রথম বছরেই সংগঠনটি প্রবীণদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেয়। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবসে চট্টগ্রামের তিন গুণী ব্যক্তিত্বকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ফোরামের কর্মকাণ্ড। সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও আয়োজন করা হয়েছে আনন্দঘন সময়ের। ওয়েস্টার্ন ক্রুজে নৌভ্রমণ ও চট্টগ্রাম বোট ক্লাবে নৈশভোজের মতো আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবীণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জানান, প্রবীণ নাগরিক ফোরাম বর্তমানে চার বছরে পথ চলছে, তবে পথটি কখনো মসৃণ ছিল না। স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও থেমে থাকেনি কার্যক্রম। এরই মধ্যে নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানার প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে ওঠে। সেই প্রয়োজন পূরণ হয় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর। নগরীর মোমিন রোডের মাইজভান্ডার নিবাসের তৃতীয় তলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় ফোরামের স্থায়ী কার্যালয়। নাম দেওয়া হয় ‘প্যারেন্টস লাউঞ্জ’।

কার্যালয়েটি এখন শুধু একটি অফিস নয়; প্রবীণদের জন্য আনন্দময় ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে রয়েছে পাঠাগার, অভ্যন্তরীণ খেলাধুলার ব্যবস্থা, ওয়াই-ফাই ও টেলিভিশনের সুবিধা। চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা প্রবীণদের থাকার জন্য ন্যূনতম মূল্যে তিন বেডের একটি এসি লিভিং রুমও স্থাপন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য— বাইরের জেলা থেকে আসা প্রবীণরা যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের সঙ্গে এখানে অবস্থান করতে পারেন। কার্যালয়টি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।

ফোরামের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল বাকী বাসসকে বলেন, ‘স্থায়ী ঠিকানা পাওয়ার পর ফোরামের কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, পরিবার ও সমাজে প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতি বছর প্রবীণদের সম্মাননা ও সংবর্ধনা চালু রাখতে চাই। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কেয়ারগিভার সার্ভিস নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালন করা হচ্ছে। অসহায়-দরিদ্র প্রবীণদের জন্যও আমাদের আলাদা উদ্যোগ আছে। তাদের ওষুধ সহায়তার জন্য ফোরাম চালু করেছে ‘ডোনেশন ফর মেডিসিন’ কার্যক্রম। এর মাধ্যমে দরিদ্রদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সহায়তা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শের আয়োজনও করা হয়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য অনুষ্ঠান, সেমিনার, আনন্দভ্রমণ ও পিকনিক আয়োজনের মাধ্যমে প্রবীণদের একঘেয়েমি দূর করে সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছে সংগঠনটি।

তিনি বলেন, ‘শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বলা নয়, প্রবীণদের জীবনের আনন্দের জায়গাগুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ফোরাম। কারণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, একাকিত্ব ও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় সমবয়সী মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হওয়া, আড্ডা দেওয়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কিংবা একসঙ্গে ভ্রমণে যাওয়াকে ফোরাম প্রবীণদের ভালো থাকার অংশ হিসেবেই দেখছে।’

ফোরামের সদস্যদের মতে, চট্টগ্রামে মাত্র ১২ জন প্রবীণকে নিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন শুধু নিজেদের মধ্যে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতের মাঝেই আর সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে প্রবীণদের অধিকার, সম্মান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

প্রবীণ নাগরিক ফোরামের এই পথচলার মূল কথাটি তাই হয়তো খুব সহজ—বয়স বাড়লেও মানুষ যেন সমাজের বাইরে চলে না যান। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজে লাগে আর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন একাকিত্বে নয়, ভালোবাসা, সম্মান, বন্ধুত্ব ও আনন্দে কাটে।’

 


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

‎বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি ঐতিহ্যবাহী উপহার দেন খুলনা আর্ট একাডেমির সংগ্রহশালায়

প্রবীণ নাগরিক ফোরাম, চট্টগ্রাম প্রবীণদের ভালো থাকার অনন্য ঠিকানা

আপডেট টাইম : ০৭:২১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পৃথিবীর চিরন্তন নিয়মে মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু কমে না জীবনের প্রয়োজন। বরং কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর অনেকের প্রয়োজন হয় একটু বেশিই সঙ্গ, একটু বেশি মমতা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও নিজের কথা বলার মতো একটি জায়গা। অথচ পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের জন্য এমন নিরাপদ, আনন্দময় ও আপন একটি পরিসর সব সময় তৈরি হয় না।

সেই বাস্তবতা থেকে চট্টগ্রামে কয়েকজন প্রবীণ নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট উদ্যোগ। আজ সেটিই হয়ে উঠেছে প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভালো থাকার নানা আয়োজনের অনন্য ঠিকানা—‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম, চট্টগ্রাম’।

আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়—‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা বাড়ার এই সময়ে প্রবীণদের জীবনকে কিভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দময় করা যায়, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে এবারের দিবসে।

চট্টগ্রামে প্রবীণ নাগরিক ফোরামের কর্মকাণ্ডও যেন সেই ভাবনারই স্থানীয় এক বাস্তব প্রয়াস।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী থেকে অবসর নেওয়া, প্রকৃতি বিষয়ক লেখক-সম্পাদক ও কবি মুশফিক হোসাইন সংগঠনটির স্বপ্নদ্রষ্টা।

তিনি একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের একাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়ে ও হোয়াটস অ্যাপে একটি গ্রুপ খুলে ‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম’ গড়ে তোলার কথা ঘোষণা দেন।

তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রবীণ একটি ক্যাফেতে বৈঠকে মিলিত হন।

সেখান থেকেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু, সেদিন ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি।

মুশফিক হোসাইন বর্তমানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বাসস-কে বলেন, ‘একটা বিষয় খেয়াল করে দেখলাম, শহরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, তারা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় শরীরচর্চা বা কোনো ক্যাফেতে মাঝে মাঝে বসে আড্ডা জমান। এই বয়সটাতে হাসি-খুশি থাকা গেলে সুস্থ থাকা যায়। তাই এই সংগঠন করার উদ্যোগ।

প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলেন— আমিনুর রশিদ কাদেরী, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল বাকী, প্রফেসর ড. রণজিৎ কুমার চৌধুরী, আব্দুল মোমেন, সত্যজিৎ মজুমদার, প্রফেসর মুজিবুল হক চৌধুরী ও সাংবাদিক স ম ইবরাহিমসহ মোট ১২ জন।’

তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে সদস্যরা মাসে এক থেকে দুবার বৈঠকে মিলিত হতেন। প্রায় দুই বছর ধরে সেই বৈঠকের অন্যতম স্থান ছিল একটি ক্যাফে। কোনো বড় অবকাঠামো, বড় আয়োজন কিংবা আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে নয়— পারস্পরিক ভালোবাসা, মমত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধকে ভিত্তি করেই এগোতে থাকে ফোরাম। বর্তমানে আমাদের সদস্য সংখ্যা ১০১ জন। সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন পদের কর্মকর্তা।

মুশফিক হোসাইন জানান, যাত্রার প্রথম বছরেই সংগঠনটি প্রবীণদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেয়। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবসে চট্টগ্রামের তিন গুণী ব্যক্তিত্বকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ফোরামের কর্মকাণ্ড। সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও আয়োজন করা হয়েছে আনন্দঘন সময়ের। ওয়েস্টার্ন ক্রুজে নৌভ্রমণ ও চট্টগ্রাম বোট ক্লাবে নৈশভোজের মতো আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবীণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জানান, প্রবীণ নাগরিক ফোরাম বর্তমানে চার বছরে পথ চলছে, তবে পথটি কখনো মসৃণ ছিল না। স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও থেমে থাকেনি কার্যক্রম। এরই মধ্যে নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানার প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে ওঠে। সেই প্রয়োজন পূরণ হয় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর। নগরীর মোমিন রোডের মাইজভান্ডার নিবাসের তৃতীয় তলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় ফোরামের স্থায়ী কার্যালয়। নাম দেওয়া হয় ‘প্যারেন্টস লাউঞ্জ’।

কার্যালয়েটি এখন শুধু একটি অফিস নয়; প্রবীণদের জন্য আনন্দময় ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে রয়েছে পাঠাগার, অভ্যন্তরীণ খেলাধুলার ব্যবস্থা, ওয়াই-ফাই ও টেলিভিশনের সুবিধা। চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা প্রবীণদের থাকার জন্য ন্যূনতম মূল্যে তিন বেডের একটি এসি লিভিং রুমও স্থাপন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য— বাইরের জেলা থেকে আসা প্রবীণরা যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের সঙ্গে এখানে অবস্থান করতে পারেন। কার্যালয়টি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।

ফোরামের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল বাকী বাসসকে বলেন, ‘স্থায়ী ঠিকানা পাওয়ার পর ফোরামের কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, পরিবার ও সমাজে প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতি বছর প্রবীণদের সম্মাননা ও সংবর্ধনা চালু রাখতে চাই। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কেয়ারগিভার সার্ভিস নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালন করা হচ্ছে। অসহায়-দরিদ্র প্রবীণদের জন্যও আমাদের আলাদা উদ্যোগ আছে। তাদের ওষুধ সহায়তার জন্য ফোরাম চালু করেছে ‘ডোনেশন ফর মেডিসিন’ কার্যক্রম। এর মাধ্যমে দরিদ্রদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সহায়তা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শের আয়োজনও করা হয়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য অনুষ্ঠান, সেমিনার, আনন্দভ্রমণ ও পিকনিক আয়োজনের মাধ্যমে প্রবীণদের একঘেয়েমি দূর করে সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছে সংগঠনটি।

তিনি বলেন, ‘শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বলা নয়, প্রবীণদের জীবনের আনন্দের জায়গাগুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ফোরাম। কারণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, একাকিত্ব ও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় সমবয়সী মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হওয়া, আড্ডা দেওয়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কিংবা একসঙ্গে ভ্রমণে যাওয়াকে ফোরাম প্রবীণদের ভালো থাকার অংশ হিসেবেই দেখছে।’

ফোরামের সদস্যদের মতে, চট্টগ্রামে মাত্র ১২ জন প্রবীণকে নিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন শুধু নিজেদের মধ্যে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতের মাঝেই আর সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে প্রবীণদের অধিকার, সম্মান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

প্রবীণ নাগরিক ফোরামের এই পথচলার মূল কথাটি তাই হয়তো খুব সহজ—বয়স বাড়লেও মানুষ যেন সমাজের বাইরে চলে না যান। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজে লাগে আর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন একাকিত্বে নয়, ভালোবাসা, সম্মান, বন্ধুত্ব ও আনন্দে কাটে।’

 


প্রিন্ট