মো: আব্দুল আজিজ:
একটি দেশের সার্বিক অগ্রগতি ও সমাজের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর। “যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তি”—উন্নয়নের মূল শর্ত এটিই। কিন্তু যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে যোগ্যতার পরিমাপক বদলে যায় এবং অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ মানুষ বড় বড় দায়িত্ব লাভ করে, তখন অবধারিতভাবেই নেমে আসে স্থবিরতা। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় একটি বড় সংকট হলো—যাঁরা প্রকৃত অর্থে দায়িত্ব পালনে অক্ষম, তাঁরাই অনভিজ্ঞ ও চাটুকার শ্রেণির প্রভাবে বড় আসনগুলো দখল করছেন। এর ফলে দেশ ও সমাজের উন্নয়ন ধীরলয়ে এগোচ্ছে এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলো সুদূরপরাহত হচ্ছে। কাজের চেয়ে কথার জৌলুস যেখানে প্রধান হয়ে ওঠে, সেখানে “বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়” প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়।
অযোগ্যদের হাতে বড় দায়িত্ব: সংকটের উৎস সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে যখন মেধা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা চাটুকারিতা প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে, তখন অযোগ্যরা ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়। যোগ্য ব্যক্তিরা যখন পেছনে পড়ে থাকেন এবং অযোগ্যরা বড় বড় নীতিনির্ধারণী পদে বসেন, তখন সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব দেখা দেয়। একজন অযোগ্য মানুষ কখনো দূরদর্শী পরিকল্পনা করতে পারেন না। তিনি সাময়িক সংকটের তাৎক্ষণিক ও ভুল সমাধান খোঁজেন, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো ব্যবস্থার ক্ষতি করে। এই অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা জেঁকে বসে।
অনভিজ্ঞতার কুফল ও ধীরগতির সমাজ অনভিজ্ঞ মানুষেরা যখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, তখন তাঁদের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় পুরো সমাজকে। রাষ্ট্র ও সমাজের চাকা সচল রাখতে হলে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন। অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন না, কারণ তাঁদের তাত্ত্বিক বা বাস্তব জ্ঞান কোনোটিই থাকে না। তাঁরা যেকোনো ফাইল বা সিদ্ধান্ত আটকে রাখেন অথবা ভুল পথে চালিত করেন। এর ফলে প্রশাসনিক গতি স্থবির হয়ে পড়ে। দেশ ও সমাজ যে গতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা অনভিজ্ঞদের অদূরদর্শিতার কারণে ধীরলয়ে এগোতে থাকে।
কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কেন সুদূরপরাহত?
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি অযোগ্য হন, তবে বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ হয় না। বাজেটের অপচয় হয়, প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত কাজের গুণগত মান বজায় থাকে না। দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ ব্যাহত হয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পরিবর্তে স্থবির হয়ে পড়ে এবং কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর বা উন্নয়ন অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়।
কাজের চাইতে কথা বেশি: বাগাড়ম্বরের সংস্কৃতি বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় ব্যাধি হলো—কাজের চেয়ে কথার প্রদর্শন। যাঁরা কাজ করতে পারেন না, তাঁরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে কথার ফুলঝুরি ছোটান। বড় বড় সেমিনার, গণমাধ্যমে দীর্ঘ বক্তৃতা এবং বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে তারা এমন এক কৃত্রিম সাফল্যের চিত্র তৈরি করেন, যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। প্রকৃত কর্মীরা নীরবে কাজ করে যান, কিন্তু এই বাচাল শ্রেণির চিৎকারের আড়ালে তাঁরা হারিয়ে যান। কাজের ক্ষেত্রে শূন্যতা এবং প্রচারের ক্ষেত্রে অতিশয়োক্তি সমাজকে এক চরম ভণ্ডামির দিকে ঠেলে দেয়। মুখে আকাশচুম্বী উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি হলো তার মানবসম্পদ। বিশেষ করে নীতি নির্ধারণী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ পদগুলোতে কারা বসছেন, তার ওপর নির্ভর করে পুরো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা কাঠামোগত সংস্কার তখনই অর্থবহ হয়, যখন শাসনদণ্ড সৎ ও যোগ্য মানুষের হাতে ন্যস্ত থাকে। তা না হলে কেবল মুখের কথায় বা বাহ্যিক আড়ম্বরে কোনো পরিবর্তন আসে না; লোকপ্রবাদের ভাষায় পরিস্থিতি দাঁড়ায়—”যেই লাউ সেই কদু”।
সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন বা বিপ্লব যতই বড় হোক না কেন, যদি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আগের মতোই অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ কিংবা তোষামোদকারীদের বসানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
রাষ্ট্রে যখন মেধা ও সততার চেয়ে দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি কিংবা ব্যক্তিগত চাটুকারিতাকে পদায়নের মাপকাঠি করা হয়, তখন পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর ফলে কয়েকটি প্রধান সংকট তৈরি হয়:
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শুধু স্লোগান বা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো জাতি উন্নত হতে পারেনি। রাষ্ট্র বা সমাজের প্রকৃত রূপান্তর ঘটে মানুষের গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সফল করতে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হলে প্রতিটি স্তরে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিকদের পদায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্যথায়, পরিবর্তনের সব আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এবং দিনশেষে পরিস্থিতি সেই আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে থাকবে।
লেখক: সমাজচিন্তক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এ্যানভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 






















