জেলায় প্রায় সাতাশ লাখ মানুষের বসবাস। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর জন্য কাছাকাছি বড় ধরনের কোন পর্যটন কেন্দ্র নেই। তাই তিন নদীর মোহনা বড় স্টেশন মোলহেড হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। এ যেন সমুদ্র সৈকতের এক ছোট রূপ। তিন নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চর সমুদ্র সৈকতের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
এবারের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। এখানে এসে সময় কাটাতে পেরে আনন্দিত সব বয়সি লোকজন।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল রোববার (২২ মার্চ) ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত তিন নদীর মোহনা ছিল লোকে লোকারণ্য। চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলা এবং জেলার বাইরে থেকে আগত দর্শনার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল মোলহেড। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেউ গণপরিবহণে, কেউবা ব্যক্তিগত গাড়ি চেপে ঘুরতে এসেছেন নদীর মোহনায়।
এই মোহনা দিনের একেক ভাগে একেক রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সেজে ওঠে। সকাল, দুপুর, গোধূলী এবং সন্ধ্যায় ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয় প্রকৃতি। বিকেলে সূর্যাস্তের সময় অভাবনীয় রূপে সেজে ওঠে মোহনার প্রকৃতি। আর জ্যোৎস্না রাত যেন স্বর্গীয় এক রূপে ধরা দেয়। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে এখানে বেশি রাত পর্যন্ত থাকার সুযোগ নেই। যারা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় তারা জ্যোৎস্না রাতে ডাকাতিয়া নদীতে নৌকায় করে রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
মোহনার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ছোট বড় ট্রলার ও স্পিড বোট। এসব ট্রলার আর স্পিড বোট দিয়ে মেঘনা নদীর পশ্চিম পাশে মিনি কক্সবাজার নামক স্থানে ঘুরে আসা যায়। তবে বিকেল ৫টার মধ্যে আবার মোহনায় চলে আসতে হয়। আসা-যাওয়া ট্রলারে জনপ্রতি ভাড়া ১০০টাকা। স্পিড বোটে জনপ্রতি ভাড়া কমপক্ষে ৩০০টাকা। এখানে আসলে মাইকে ঘোষণা শোনা যাবে ট্রলারে যাওয়ার জন্য।
জেলার কচুয়া থেকে ঘুরতে আসা শাহাদাত হোসেন বলেন, ঈদ ছাড়াও অবসর পেলেই মাঝে মাঝে এখানে ঘুরতে আসেন তিনি। বেশ কয়েকবার এসেছেন।
এখানকার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য বারবার তাকে যেন হাতছানি দেয়।
একই উপজেলার শিক্ষক সোলাইমান বলেন, মূলত জেলার পরিচিতি হচ্ছে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’। আর এই স্থানটিতে আসলে ইলিশের বাড়ির আনন্দ পাওয়া যায়। নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই চমৎকার। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্থান।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা থেকে ঘুরতে এসেছেন আল-আমিন ও তার তিন বন্ধু। তারা এর আগেও এসেছেন। এবারের ঈদে তাদের ঘোরাঘুরির অন্যতম স্থান তিন নদীর মোহনা। জানালেন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাদের প্রতিটি মুহূর্ত খুবই চমৎকার কেটেছে।
বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন চাঁদপুর সদর উপজেলার মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, এখানকার নদীর ঢেউ ও পরিবেশ দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যে কেউ ভাল সময় কাটাতে পারবেন। ঈদ উপলক্ষে বহু মানুষ ঘুরতে এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে এই জায়গাটি তার কাছে খুবই ভালো লেগেছে।
চাঁদপুর বারের আইনজীবী ও লেখক রফিকুজ্জামান রণি বলেন, জেলার সাতাশ লাখ মানুষের জন্য বিশেষ কোন বিনোদন কেন্দ্র নেই। যে কারণে সাধারণ মানুষ উৎসব কিংবা অবসরে তিন নদীর মোহনায় আসে। তবে এবারের ঈদের আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই এলাকার অস্থায়ী দোকানগুলো উচ্ছেদ করায় পরিবেশ আরো সুন্দর হয়েছে।
সাংস্কৃতিক সংগঠক ও অভিনেতা শরীফ চৌধুরী বলেন, বিনোদন কিংবা সময় কাটানোর কোন ভালো পর্যটন কেন্দ্র না থাকায় লোকজন তিন নদীর মোহনায় এসে ভিড় জমায়। তবে সরকারিভাবে মেরিন ড্রাইভ কিংবা বড় ধরনের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ সময় কাটানোর জন্য বিনোদন কেন্দ্র পাবে।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ বলেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে পুলিশ পুরো শহরে দিন ও রাতে দায়িত্ব পালন করছে। বিশেষ করে তিন নদীর মোহনায় আসা পর্যটকদের যাতে কোন ধরনের সমস্যা না হয় সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএমএস ইকবাল বলেন, লঞ্চঘাটসহ চাঁদপুর নৌ এলাকায় নৌ পুলিশ সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা রেখেছে। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে তিন নদীর মোহনা নজরদারিতে রয়েছে।