চৈতি দাস:
একজন আদর্শ মানুষ হতে গেলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেই হয় না; এর পাশাপাশি প্রয়োজন মনুষ্যত্ববোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা। মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করি আমরা সবাই, কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারি কতজন?আমার মনে হয়, এর অন্যতম কারণ হলো শৈশব থেকেই আমাদের অনেক সময় শেখানো হয় না কীভাবে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অন্যের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হয় এবং কীভাবে একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। যদি পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই আমাদের আদর্শ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হতো, তাহলে আমরা অনেক বেশি সচেতনভাবে সেই মূল্যবোধগুলো নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারতাম।পড়াশোনা করে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু সেই জ্ঞান ও সামর্থ্য দিয়ে অন্য মানুষের কতটা উপকার করতে পারছি সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অর্থনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার আচরণ, চরিত্র, মানবিকতা ও অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।একজন আদর্শ মানুষ অন্যের ক্ষতি না করে নিজের জীবনকে উন্নত করার পাশাপাশি সমাজের উন্নতিতেও ভূমিকা রাখে। অন্যের দুঃখে সহমর্মী হওয়া, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা এসব গুণ একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।আমি মনে করি, শুধু পড়াশোনা করলেই কেউ আদর্শ মানুষ হতে পারে না। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নৈতিকতা, গুণাবলি, বড়দের প্রতি সম্মান, ছোটদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ সবকিছু মিলেই একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে।
একজন মানুষের মধ্যে যদি মনুষ্যত্ববোধ না থাকে, তাহলে তার অর্জিত শিক্ষা সমাজ ও মানুষের কতটা কাজে আসবে?অন্যের কষ্টে যদি আমি কষ্ট অনুভব না করি, একজন মানুষের খারাপ সময়ে যদি তার পাশে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে নিজেকে কখনোই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে দাবি করতে পারব না। তাই একজন আদর্শ মানুষের মধ্যে অন্যের প্রতি সহানুভূতি, সহযোগিতার মানসিকতা ও মানবিক দায়িত্ববোধ থাকা অত্যন্ত জরুরি।বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের ভালোবাসা ও স্নেহ করা আমাদের ছোটবেলা থেকেই শিখতে হবে। সমাজে সুন্দর ও ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করাও আমাদের দায়িত্ব। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয় এটি সত্য। কিন্তু সেই জ্ঞানকে জীবনে ধারণ ও প্রয়োগ করতে না পারলে শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা কোথায়?আমরা যদি ছোটদের ভালোবাসতে না শিখি, বড়দের সম্মান করতে না শিখি এবং মানুষের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়াতে না শিখি, তাহলে সমাজ আমাদের কাছ থেকে কীভাবে ভালোবাসা ও সম্মান প্রত্যাশা করবে?শৈশবকে বলা হয় একজন মানুষের চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। একটি গাছকে বড় করে তুলতে যেমন শুরুতেই ভালো বীজ বপন করতে হয়, তেমনি একজন মানুষকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতেও শৈশবেই তার মধ্যে নৈতিকতা, মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের বীজ বপন করতে হয়।
সেই বীজ থেকেই ভবিষ্যতে একজন ভালো মানুষ তৈরি হয় এবং সে সমাজের জন্য ভালো কিছু করার সুযোগ পায়।তাই অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের দায়িত্ব হলো শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া। কারণ একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, সুশিক্ষিত ও মানবিক মানুষ প্রয়োজন।আমার অনুভূতি আমি চৈতি দাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনার প্রস্তুতির জন্য খুলনা আর্ট একাডেমির ১৭তম ব্যাচের চারুকলা ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছি। এখানে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস স্যার আমাদের পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেন। একজন ভালো মানুষ হতে হলে কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন, কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় এবং সমাজের প্রতি আমাদের কী ধরনের দায়িত্ব রয়েছে এসব বিষয় নিয়েও তিনি আমাদের ভাবতে শেখান।আজকের এই লেখাটি লেখার পেছনেও চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস স্যারের অনুপ্রেরণা রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাই আমাকে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে এবং নিজের অনুভূতিগুলো লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেছে। এ জন্য আমি স্যারের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
আমার এই লেখা পড়ে যদি একজন পাঠকও নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কথা ভাবেন, যদি কেউ একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পান, তাহলেই আমি মনে করব আমার লেখাটি সার্থক হয়েছে।আমি আমার বয়োজ্যেষ্ঠ, শিক্ষাগুরু, পিতা-মাতা এবং সকল শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে আশীর্বাদ ও শুভকামনা প্রত্যাশা করি। খুলনা আর্ট একাডেমিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আমি শিল্পবোধের সঙ্গে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাও অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছি। এই শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ জীবনকে আরও সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলবে এটাই আমার প্রত্যাশা।লেখার মধ্যে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 

























