ঢাকা ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সামাজিক আন্দোলন ছাড়া মাদক নির্মূল করা যাবে না। এমপি, ফজলুল হক মিলন জোনাকী শিল্পীগোষ্টি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন নবনিযুক্ত গাইবান্ধা ডিসিকে বিএনপি নেতৃবৃন্দের ফুলেল শুভেচ্ছা। সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সুনামগঞ্জ জেলা জন্মাষ্টমী পরিষদের নেতৃবৃন্দরা রিংকি হত্যা: ন্যায়বিচারের দাবিতে উলিপুরে মানববন্ধন বঙ্গভবনে নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম শুরু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে একসঙ্গে কাজ করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর আহ্বান সাত বছর পর নাটকে ফিরলেন শার্লিন ফারজানা `২৪-এর আন্দোলন ফাইনাল যুদ্ধ নয়, এটা ছিল যুদ্ধের রিহার্সেল’ অস্ট্রেলিয়া সফরের অভিজ্ঞতা সামনে কাজে লাগাতে চান শান্ত

ভোটের রাজনীতিতে বিষোদগার নয়, প্রয়োজন আগামীর ভিশন

জাহিদ ইকবাল: নির্বাচন সামনে এলেই আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক বিষোদগার, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর কাদা ছোড়াছুড়ি যেভাবে রাজনৈতিক শালীনতাকে অতিক্রম করছে, তা নাগরিক সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।

গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, যুক্তির পাল্টা যুক্তি থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন রাজনীতির ভাষা থেকে নীতি-আদর্শ হারিয়ে গিয়ে কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাধান্য পায়, তখন গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভোট আসলে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি জনমতের প্রতিফলন এবং জনসেবার নতুন অঙ্গীকার। তাই এই প্রতিযোগিতায় কে কাকে কত তীব্র ভাষায় আক্রমণ করল, তার চেয়ে বড় বিচার্য হওয়া উচিত—কে দেশের সংকটে কতটুকু বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারছে।

বিশ্বের সফল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার ভোটাররা মূলত অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার মান দেখে সিদ্ধান্ত নেন।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, আমাদের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এই বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে খুব একটা জোরালোভাবে আসছে না। অথচ তরুণ ভোটাররা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং তথ্য যাচাইয়ে পারদর্শী; তারা সস্তা আবেগি স্লোগানের চেয়ে সংখ্যা ও তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখতে বেশি আগ্রহী।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট এখন দ্রব্যমূল্য ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থপাচার রোধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

ভোটাররা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে শুনতে চায়—দুর্নীতি দমনে তাদের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে, কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির কত শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

রাজনীতিতে সহিংস ভাষা ব্যবহারের একটি বড় ঝুঁকি হলো, এটি মাঠপর্যায়ে সংঘাতের উসকানি দেয়। শীর্ষ নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে অনেক সময় কর্মীরা সহিংস আচরণের ছাড়পত্র হিসেবে ধরে নেয়, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রকৃতপক্ষে, নির্বাচন হওয়া উচিত উৎসবের মতো, আতঙ্কের নয়। মানুষ চায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যাবে এবং প্রার্থীরা তর্কে লিপ্ত হবেন তথ্য ও উন্নত নীতির ভিত্তিতে। আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর এখন সময়ের দাবি।

ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন; তারা বুঝে গেছে যে বিষোদগার বা প্রতিশোধের রাজনীতি দেশের ভাগ্য বদলায় না। দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দলগুলোর পক্ষ থেকে লিখিত, সময়বদ্ধ এবং পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি।

কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি বন্ধ করে এখন সময় কাজের কথা বলার, কারণ আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

সামাজিক আন্দোলন ছাড়া মাদক নির্মূল করা যাবে না। এমপি, ফজলুল হক মিলন

ভোটের রাজনীতিতে বিষোদগার নয়, প্রয়োজন আগামীর ভিশন

আপডেট টাইম : ০১:৫৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাহিদ ইকবাল: নির্বাচন সামনে এলেই আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক বিষোদগার, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর কাদা ছোড়াছুড়ি যেভাবে রাজনৈতিক শালীনতাকে অতিক্রম করছে, তা নাগরিক সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।

গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, যুক্তির পাল্টা যুক্তি থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন রাজনীতির ভাষা থেকে নীতি-আদর্শ হারিয়ে গিয়ে কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাধান্য পায়, তখন গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভোট আসলে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি জনমতের প্রতিফলন এবং জনসেবার নতুন অঙ্গীকার। তাই এই প্রতিযোগিতায় কে কাকে কত তীব্র ভাষায় আক্রমণ করল, তার চেয়ে বড় বিচার্য হওয়া উচিত—কে দেশের সংকটে কতটুকু বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারছে।

বিশ্বের সফল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার ভোটাররা মূলত অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার মান দেখে সিদ্ধান্ত নেন।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, আমাদের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এই বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে খুব একটা জোরালোভাবে আসছে না। অথচ তরুণ ভোটাররা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং তথ্য যাচাইয়ে পারদর্শী; তারা সস্তা আবেগি স্লোগানের চেয়ে সংখ্যা ও তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখতে বেশি আগ্রহী।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট এখন দ্রব্যমূল্য ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থপাচার রোধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

ভোটাররা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে শুনতে চায়—দুর্নীতি দমনে তাদের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে, কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির কত শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

রাজনীতিতে সহিংস ভাষা ব্যবহারের একটি বড় ঝুঁকি হলো, এটি মাঠপর্যায়ে সংঘাতের উসকানি দেয়। শীর্ষ নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে অনেক সময় কর্মীরা সহিংস আচরণের ছাড়পত্র হিসেবে ধরে নেয়, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রকৃতপক্ষে, নির্বাচন হওয়া উচিত উৎসবের মতো, আতঙ্কের নয়। মানুষ চায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যাবে এবং প্রার্থীরা তর্কে লিপ্ত হবেন তথ্য ও উন্নত নীতির ভিত্তিতে। আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর এখন সময়ের দাবি।

ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন; তারা বুঝে গেছে যে বিষোদগার বা প্রতিশোধের রাজনীতি দেশের ভাগ্য বদলায় না। দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দলগুলোর পক্ষ থেকে লিখিত, সময়বদ্ধ এবং পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি।

কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি বন্ধ করে এখন সময় কাজের কথা বলার, কারণ আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।


প্রিন্ট