ঢাকা ১০:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তালা বাজার বণিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন সন্ত্রাসী হা/ম/লা ও হ/ত্যার হু/মকির অভিযোগ দীর্ঘদিন আত্মগোপনের পর ঢাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের দুই নেতা আটক টানা বৃষ্টিতে গাইবান্ধার ১৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা পানির নিচে মা/দকের বি/রুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বাস্তবায়ন করতে হবে: আরপিএমপি কমিশনার দেশে হামে শিশুমৃত্যু ৮০০ ছুঁইছুঁই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান খানের পদত্যাগ স্পেনে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে লড়ছে দমকলকর্মীরা অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষার তারিখ পেছাল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় জাবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৮ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য ভূমিসেবা সহজ করার নির্দেশ ভূমিমন্ত্রীর

বিশ্বকে আধুনিক শিক্ষার পথ দেখিয়েছিলেন যে মুসলিম মনীষীরা এবং তাদের অমুল্য অবদান

সিটিজেন নিউজ ডেস্ক: আজ দুনিয়া ইসলামকে ও মুসলমানদের একটি অতি অসভ্য ও পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে অভিহিত করে। যেহেতু আজকের মুসলিমরা নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে অক্ষম ও অসফল হয়েছে। কিন্তু এই মুসলমানের বাপ দাদারাই ছিলেন আসল সভ্যতা ও উন্নতির পথ প্রদর্শনকারী। আজকের যেসব অতিউন্নত যন্ত্র পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের সামনে প্রকট করে তার আসল আবিষ্কারক তো আসলে ছিলেন তাঁরাই। ইতিহাসের প্রত্যেক ছাত্রের কাছে পরিচিত, যে জ্ঞানে, গরিমায়, শিক্ষায়, সভ্যতায়, ইবাদতে, উপাসনায়, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, কাব্যে, সাহিত্যে, শিল্পে, বানিজ্যে, বিজ্ঞানে, দর্শনে, ধর্মে, কর্মে, ত্যাগে, তিতিক্ষায়, মহানুভবতায়, পরোপকারিতায় শৌর্যে, বীর্যে ও চরিত্র মাধুর্যে মুসলমান জাতিই দুনিয়ার শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল।

আবু জায়েদ বলখী কে?

অতীতে যখন মানসিক অসুস্থতা শব্দটির সাথে মানুষ পরিচিত ছিল না এবং একে জিনে ধরা বা অপ্রকৃতিস্থ মন বলে ভুল ভাবা হতো, তখন নবম শতকের একজন পণ্ডিত আবু জায়েদ আহমদ ইবনে সাহল আল-বলখী তার সমসাময়িকদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে ছিলেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম মুসলিম চিকিৎসক যিনি মানসিক ব্যাধির দুটি রূপ—সাইকোসিস ও নিউরোসিসের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন।

বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ শহরের একটি পারস্য গ্রামে ২৩৫ হিজরি মোতাবেক ৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে আল-বলখী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে ভূগোল, চিকিৎসা, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, দর্শন, কবিতা, আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ, গণিত ও নীতিশাস্ত্রের মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে ৬০টিরও বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি রচনা করেছেন। জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি নিজ শহর ছেড়ে বাগদাদে চলে যান এবং সে যুগের বিজ্ঞদের কার্যপদ্ধতি শিখতে ও ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান অর্জনের জন্য সেখানে আট বছর অবস্থান করেন।

অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ওপর তিনি মাসালিহ আল-আবদান ওয়া আল-আনফুস বা শরীর ও আত্মার রসদ শিরোনামে একটি পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন। এই পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে ইস্তাম্বুলের হাজিয়া সোফিয়া লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। এর দুটি ভিন্ন অংশ ছিল; প্রথম অংশটি শরীর এবং দ্বিতীয় অংশটি আত্মার ওপর আলোকপাত করে। আধুনিক ইসলামিক সাইকোলজির জনক ডক্টর মালিক বদরি এটি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছেন, যা আবু জায়েদ আল-বলখীস সাসটেন্যান্স অব দ্য সোল নামে প্রকাশিত হয়েছে।

ইসলামিক সাইকোলজির এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রোগ বিশ্লেষণ এবং মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, ভয়, উদ্বেগ ও ফোবিয়ার মতো ব্যাধি নির্ণয়ে আল-বলখীর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা এবং কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে এগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়।

আল-বলখীই প্রথম মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন এবং আবেগজনিত ব্যাধির লক্ষণগুলো চিহ্নিত করেন। উদাহরণস্বরূপ, অনেকে মনে করতে পারেন যে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডি নিয়ে ১৬০০ সালের দিকে প্রথম আলোচনা হয়েছিল। তবে মিশরীয়-আমেরিকান ইসলামিক স্কলার ও মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর রানিয়া আওয়াদ তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে ইতিহাস বদলে দেওয়া এক তথ্য সামনে আনেন। তিনি দেখান যে, নবম শতকেই আল-বলখী এই ওসিডির বিবরণ দিয়েছিলেন।

বুখারার এতিম বালক যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজয়ী হাদিস সম্রাট
ইউরোপীয় মনোরোগ বিদ্যায় এমন অগ্রগতি হওয়ার প্রায় এক হাজার বছর আগেই ওসিডির মতো মানসিক অসুস্থতার সঠিক শ্রেণিবিভাগ, রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর চিকিৎসার প্রস্তাবকারী হিসেবে এখন আল-বলখীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মজার বিষয় হলো, মানুষের সহজাত স্বভাব থেকে তৈরি হওয়া অবসেসিভ ডিজঅর্ডার বা শুচিবায়ু নিয়ে তার দেওয়া বিবরণটি বর্তমান ডিএসএম ফাইভের অবসেসিভ-কম্পালসিভ পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের বৈশিষ্ট্যের সাথে হুবহু মিলে যায়।

তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে স্বীকার করেছিলেন এবং একে শুধু ঈমানের অভাব বলে উড়িয়ে দেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, মানুষের যেমন সর্দি-জ্বর বা শারীরিক ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক, তেমনি যেকোনো দিন দুঃখ, উদ্বেগ বা রাগ অনুভব করাও অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের ধারণাটিকে স্বাভাবিক করা এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকার প্রদান করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মার ধারণা

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তার অন্তর্দৃষ্টি আরও ব্যাপক পরিধি জুড়ে ছিল, যা আত্মা এবং আল্লাহর ইবাদতকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের প্রায় হাজার বছর আগেই শরীর-মন-আত্মার সামগ্রিক সুস্থতার বিষয়ে তার এই প্রচার এক ঐতিহাসিক অবদান। তার পাণ্ডুলিপিটি অনন্য কারণ এটি আত্মা ও শরীরের গভীর মিথস্ক্রিয়া এবং এই দুটির ভারসাম্যের অভাব কীভাবে উভয় পক্ষকে প্রভাবিত করে তা তুলে ধরে। তার ভাষায়, যখন আত্মা মনস্তাত্ত্বিক কষ্টে আক্রান্ত হয়, তখন শরীর তার আনন্দ উপভোগের স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত ও অশান্ত। শুধু তাই নয়, মনস্তাত্ত্বিক কষ্ট একপর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

কোনো আঘাতের ঘটনায় আমরা যেভাবে ফার্স্ট এইড বক্স বা প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ব্যবহার করি, আল-বলখী বলেছিলেন যে নিজের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসা বক্স রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন মানসিকভাবে উত্তেজিত থাকি এবং মনের কথা শোনার মতো কেউ থাকে না, তখন আমাদের প্রথম সাহায্য হওয়া উচিত মনের ভেতর ইতিবাচক চিন্তাভাবনা তৈরি করা, যা আমাদের সেই উত্তেজনা প্রশমিত করতে সাহায্য করবে। এই সুস্থ চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রাখলে তা আবেগের বিস্ফোরণের সময় আমাদের বড় অবলম্বন হবে।

কগনিটিভ থেরাপির অগ্রদূত

গবেষণার মাধ্যমে আবু জায়েদ আল-বলখী দেখেছিলেন যে, মানুষ যেসব বিষয়কে ভয় পায়, সেগুলো নিয়ে যৌক্তিক ও যুক্তিপূর্ণভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে সেগুলো আসলে ততটা ক্ষতিকারক নয়। তার পদ্ধতি ছিল মানুষের নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা এবং তাদের এটা বোঝানো যে তাদের ভেতরের নেতিবাচক ধারণাগুলো আসলে ভিত্তিহীন। এই পদ্ধতিটি বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত রেশনাল ইমোটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির বা আরইবিটির মতো, যা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির একটি অংশ। এটি মানুষকে অনুৎপাদনশীল চিন্তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে যাতে নেতিবাচক অনুভূতি বা কাজ প্রতিরোধ করা যায়। এর ফলে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে নিজের প্রতিক্রিয়ার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি, যা জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।

আল-বলখী থেরাপির ক্ষেত্রে একটি অনন্য পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস এবং মানুষের স্বভাবজাত ইসলামিক ধারণার এক সামগ্রিক রূপ ছিল। তিনি তার সেবাগ্রহীতাদের মনে করিয়ে দিতেন যে, এই পৃথিবী পরম আনন্দের জায়গা নয় বা সব ইচ্ছা পূরণের স্থানও নয়। এই উপলব্ধিই তাদের আবেগজনিত ব্যাধির লক্ষণগুলো মানসিকভাবে উপশম করতে সাহায্য করত।

শেষ কথা

বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে পৌঁছেছি যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। যদিও আজ অব্দি অনেক সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে বাঁকা চোখে দেখা হয়, তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা ও সচেতনতা বাড়ছে। ফলে মানুষ সমস্যা সমাধানে নানামুখী পথ খুঁজে পাচ্ছে। তদুপরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে নানা উপায় বের করেছেন।

আবু জায়েদ আল-বলখীর অবদানের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে যে, ইসলামে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতখানি এবং তা শুধু আধুনিক যুগের কোনো আবিষ্কার নয়। প্রকৃতপক্ষে, মানবজাতিকে এই বিষয়ে ইসলাম মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি দেয়। মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ ও বিকাশে বিশ্বাস যে কতটা অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে, তা এই নিবন্ধে স্পষ্ট। এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের প্রতি ইসলামের সামগ্রিক ভাবনা থেকে এসেছে, যা মানুষকে শুধু দেহ ও মনের সমষ্টি হিসেবে দেখে না, বরং আত্মার উপস্থিতিও স্বীকার করে।

 

 

 

 

 


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

তালা বাজার বণিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন সন্ত্রাসী হা/ম/লা ও হ/ত্যার হু/মকির অভিযোগ

বিশ্বকে আধুনিক শিক্ষার পথ দেখিয়েছিলেন যে মুসলিম মনীষীরা এবং তাদের অমুল্য অবদান

আপডেট টাইম : ০৮:৪৮:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

সিটিজেন নিউজ ডেস্ক: আজ দুনিয়া ইসলামকে ও মুসলমানদের একটি অতি অসভ্য ও পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে অভিহিত করে। যেহেতু আজকের মুসলিমরা নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে অক্ষম ও অসফল হয়েছে। কিন্তু এই মুসলমানের বাপ দাদারাই ছিলেন আসল সভ্যতা ও উন্নতির পথ প্রদর্শনকারী। আজকের যেসব অতিউন্নত যন্ত্র পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের সামনে প্রকট করে তার আসল আবিষ্কারক তো আসলে ছিলেন তাঁরাই। ইতিহাসের প্রত্যেক ছাত্রের কাছে পরিচিত, যে জ্ঞানে, গরিমায়, শিক্ষায়, সভ্যতায়, ইবাদতে, উপাসনায়, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, কাব্যে, সাহিত্যে, শিল্পে, বানিজ্যে, বিজ্ঞানে, দর্শনে, ধর্মে, কর্মে, ত্যাগে, তিতিক্ষায়, মহানুভবতায়, পরোপকারিতায় শৌর্যে, বীর্যে ও চরিত্র মাধুর্যে মুসলমান জাতিই দুনিয়ার শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল।

আবু জায়েদ বলখী কে?

অতীতে যখন মানসিক অসুস্থতা শব্দটির সাথে মানুষ পরিচিত ছিল না এবং একে জিনে ধরা বা অপ্রকৃতিস্থ মন বলে ভুল ভাবা হতো, তখন নবম শতকের একজন পণ্ডিত আবু জায়েদ আহমদ ইবনে সাহল আল-বলখী তার সমসাময়িকদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে ছিলেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম মুসলিম চিকিৎসক যিনি মানসিক ব্যাধির দুটি রূপ—সাইকোসিস ও নিউরোসিসের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন।

বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ শহরের একটি পারস্য গ্রামে ২৩৫ হিজরি মোতাবেক ৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে আল-বলখী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে ভূগোল, চিকিৎসা, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, দর্শন, কবিতা, আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ, গণিত ও নীতিশাস্ত্রের মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে ৬০টিরও বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি রচনা করেছেন। জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি নিজ শহর ছেড়ে বাগদাদে চলে যান এবং সে যুগের বিজ্ঞদের কার্যপদ্ধতি শিখতে ও ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান অর্জনের জন্য সেখানে আট বছর অবস্থান করেন।

অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ওপর তিনি মাসালিহ আল-আবদান ওয়া আল-আনফুস বা শরীর ও আত্মার রসদ শিরোনামে একটি পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন। এই পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে ইস্তাম্বুলের হাজিয়া সোফিয়া লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। এর দুটি ভিন্ন অংশ ছিল; প্রথম অংশটি শরীর এবং দ্বিতীয় অংশটি আত্মার ওপর আলোকপাত করে। আধুনিক ইসলামিক সাইকোলজির জনক ডক্টর মালিক বদরি এটি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছেন, যা আবু জায়েদ আল-বলখীস সাসটেন্যান্স অব দ্য সোল নামে প্রকাশিত হয়েছে।

ইসলামিক সাইকোলজির এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রোগ বিশ্লেষণ এবং মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, ভয়, উদ্বেগ ও ফোবিয়ার মতো ব্যাধি নির্ণয়ে আল-বলখীর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা এবং কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে এগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়।

আল-বলখীই প্রথম মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন এবং আবেগজনিত ব্যাধির লক্ষণগুলো চিহ্নিত করেন। উদাহরণস্বরূপ, অনেকে মনে করতে পারেন যে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডি নিয়ে ১৬০০ সালের দিকে প্রথম আলোচনা হয়েছিল। তবে মিশরীয়-আমেরিকান ইসলামিক স্কলার ও মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর রানিয়া আওয়াদ তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে ইতিহাস বদলে দেওয়া এক তথ্য সামনে আনেন। তিনি দেখান যে, নবম শতকেই আল-বলখী এই ওসিডির বিবরণ দিয়েছিলেন।

বুখারার এতিম বালক যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজয়ী হাদিস সম্রাট
ইউরোপীয় মনোরোগ বিদ্যায় এমন অগ্রগতি হওয়ার প্রায় এক হাজার বছর আগেই ওসিডির মতো মানসিক অসুস্থতার সঠিক শ্রেণিবিভাগ, রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর চিকিৎসার প্রস্তাবকারী হিসেবে এখন আল-বলখীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মজার বিষয় হলো, মানুষের সহজাত স্বভাব থেকে তৈরি হওয়া অবসেসিভ ডিজঅর্ডার বা শুচিবায়ু নিয়ে তার দেওয়া বিবরণটি বর্তমান ডিএসএম ফাইভের অবসেসিভ-কম্পালসিভ পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের বৈশিষ্ট্যের সাথে হুবহু মিলে যায়।

তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে স্বীকার করেছিলেন এবং একে শুধু ঈমানের অভাব বলে উড়িয়ে দেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, মানুষের যেমন সর্দি-জ্বর বা শারীরিক ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক, তেমনি যেকোনো দিন দুঃখ, উদ্বেগ বা রাগ অনুভব করাও অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের ধারণাটিকে স্বাভাবিক করা এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকার প্রদান করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মার ধারণা

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তার অন্তর্দৃষ্টি আরও ব্যাপক পরিধি জুড়ে ছিল, যা আত্মা এবং আল্লাহর ইবাদতকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের প্রায় হাজার বছর আগেই শরীর-মন-আত্মার সামগ্রিক সুস্থতার বিষয়ে তার এই প্রচার এক ঐতিহাসিক অবদান। তার পাণ্ডুলিপিটি অনন্য কারণ এটি আত্মা ও শরীরের গভীর মিথস্ক্রিয়া এবং এই দুটির ভারসাম্যের অভাব কীভাবে উভয় পক্ষকে প্রভাবিত করে তা তুলে ধরে। তার ভাষায়, যখন আত্মা মনস্তাত্ত্বিক কষ্টে আক্রান্ত হয়, তখন শরীর তার আনন্দ উপভোগের স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত ও অশান্ত। শুধু তাই নয়, মনস্তাত্ত্বিক কষ্ট একপর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

কোনো আঘাতের ঘটনায় আমরা যেভাবে ফার্স্ট এইড বক্স বা প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ব্যবহার করি, আল-বলখী বলেছিলেন যে নিজের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসা বক্স রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন মানসিকভাবে উত্তেজিত থাকি এবং মনের কথা শোনার মতো কেউ থাকে না, তখন আমাদের প্রথম সাহায্য হওয়া উচিত মনের ভেতর ইতিবাচক চিন্তাভাবনা তৈরি করা, যা আমাদের সেই উত্তেজনা প্রশমিত করতে সাহায্য করবে। এই সুস্থ চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রাখলে তা আবেগের বিস্ফোরণের সময় আমাদের বড় অবলম্বন হবে।

কগনিটিভ থেরাপির অগ্রদূত

গবেষণার মাধ্যমে আবু জায়েদ আল-বলখী দেখেছিলেন যে, মানুষ যেসব বিষয়কে ভয় পায়, সেগুলো নিয়ে যৌক্তিক ও যুক্তিপূর্ণভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে সেগুলো আসলে ততটা ক্ষতিকারক নয়। তার পদ্ধতি ছিল মানুষের নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা এবং তাদের এটা বোঝানো যে তাদের ভেতরের নেতিবাচক ধারণাগুলো আসলে ভিত্তিহীন। এই পদ্ধতিটি বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত রেশনাল ইমোটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির বা আরইবিটির মতো, যা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির একটি অংশ। এটি মানুষকে অনুৎপাদনশীল চিন্তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে যাতে নেতিবাচক অনুভূতি বা কাজ প্রতিরোধ করা যায়। এর ফলে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে নিজের প্রতিক্রিয়ার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি, যা জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।

আল-বলখী থেরাপির ক্ষেত্রে একটি অনন্য পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস এবং মানুষের স্বভাবজাত ইসলামিক ধারণার এক সামগ্রিক রূপ ছিল। তিনি তার সেবাগ্রহীতাদের মনে করিয়ে দিতেন যে, এই পৃথিবী পরম আনন্দের জায়গা নয় বা সব ইচ্ছা পূরণের স্থানও নয়। এই উপলব্ধিই তাদের আবেগজনিত ব্যাধির লক্ষণগুলো মানসিকভাবে উপশম করতে সাহায্য করত।

শেষ কথা

বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে পৌঁছেছি যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। যদিও আজ অব্দি অনেক সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে বাঁকা চোখে দেখা হয়, তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা ও সচেতনতা বাড়ছে। ফলে মানুষ সমস্যা সমাধানে নানামুখী পথ খুঁজে পাচ্ছে। তদুপরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে নানা উপায় বের করেছেন।

আবু জায়েদ আল-বলখীর অবদানের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে যে, ইসলামে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতখানি এবং তা শুধু আধুনিক যুগের কোনো আবিষ্কার নয়। প্রকৃতপক্ষে, মানবজাতিকে এই বিষয়ে ইসলাম মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি দেয়। মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ ও বিকাশে বিশ্বাস যে কতটা অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে, তা এই নিবন্ধে স্পষ্ট। এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের প্রতি ইসলামের সামগ্রিক ভাবনা থেকে এসেছে, যা মানুষকে শুধু দেহ ও মনের সমষ্টি হিসেবে দেখে না, বরং আত্মার উপস্থিতিও স্বীকার করে।

 

 

 

 

 


প্রিন্ট